গুচ্ছ কবিতা
বিনয় কর্মকার
শিরদাঁড়া
সাত বিছানায় শোয়ার শর্তে; সতী-সাবিত্রীর রোলটা নিইনি বলে,
আমার জন্য বরাদ্দ হলো বাইজির পাঠ!!
রিওট্যাক্সিসের ধনাত্মক সুবিধাটা আমিও যে বুঝি না তা কিন্তু নয়;
তবু ছোঁয়াচে রোগীর ঠোঁটে চুমু খেতে নেই —-
ভোক্তা
একজোড়া পুরোনো চটি, তারচেয়ে পুরোনো নিজের পা,
জলকাদার পথ হলে সতর্কে এড়িয়ে যাই।
তবু স্বেচ্ছাচার সময়ের চাকা, বেপরোয়া গতি—-
আচমকাই নষ্ট করে দিয়ে যায় দৈনন্দিন পরনের পোশাক।
দেশভাগের অবশিষ্ট
গৃহস্থের তই-তই ডাক শুনে চলে গেছে কেউ-কেউ—-
ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায়, অচেনা মগডাল ঠিক খুঁজে নেয় সারসের ডানা–
সূর্যকে পেছনে ফেলে, একঝাঁক ধূসর পাখি এখনও আকাশে ওড়ে—
মসলার গা-গলে এখন স্বদেশী কণ্ঠস্বর: তই-তই তই—
হাওড় জলে ভাসে বিপন্ন এক হাঁস—
পরিচর্যা
গোলাপের চারাগুলো বড়ো হতে-হতে বেসামাল হয়ে পড়ে বাগানজুড়ে,
মোহনীয় পাপড়ি ঢাকা পড়ে কাঁটায়-কাঁটায়–
বনসাই সে-ও এক নির্মম শিল্প!!
তবু ছেঁটেছুঁটে না রাখলে পাতাবাহারও তার সৌন্দর্য হারায়।
অনায়াসে বেড়ে ওঠে বিছুটির বন—
সায়াহ্নের ডালে
সান্ধ্যভ্রমণে থাকে নিরাপদ ফেরার তাড়া,
তবে-কি মনের ভুলে বহুদূর চলে এসেছি?
এ কোন অচেনা পথ, অন্ধকার ধেয়ে আসে—-
ধারাবাহিকের খণ্ডচিত্র গায়ে মেখে শুয়ে আছে মৃতপ্রায় নদী,
বুকে তার বিলাপমাখা তীব্র স্রোতের ঘা—-
জংধরা লোহার ব্রিজ; কেশর দুলিয়ে ছুটে চলে রাতের ট্রেন–
ঘরমুখী হতেই দেখি; টর্চের আলোও ক্ষীণ হয়ে আসে—
সুচরিতাসু-১
প্রিয় নাম লিখে কাটাকুটি, স্কুলের পুরেনো খাতা,
হকারের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে সেই কবে,
হয়তো সময়ের কাছে আমরাও—
মধুবালার সিঁদুর পরানো ভিউকার্ড,
বইয়ের ভাঁজে ইতিহীন দু’একটা চিঠি স্মৃতির নদীতে এখনও রেখেছো? না-কী!!–
ছাতিম গাছের গায়ে লেখা যুগল সে-নাম প্রায় মিশে গেছে—-
অ্যালবামে একটাই সাদাকালো ছবি, তোমার হাসিমুখ,
দেখে মনে হয় পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই—-
সুচরিতাসু-২
এখনো বইয়ের পাতা উল্টাতেই ভেসে ওঠে তোমার মুখ—
সেই তুমি,
বাল্মিকী যুগেরও আগে, তবু মনে হয় এই-তো সেদিন—
দেখতে-দেখতে রামায়ণ-যুগের আগুন থিতিয়ে এলো;
শেষ হলো প্রহসনের অগ্নিপরিক্ষা, সীতার পাতাল পর্ব—-
বিসৃত শিলার রেডিওকার্বন ডেটিং-এ দেখি দ্রৌপদী বিক্রির হাট,
ন্যুব্জময় পাণ্ডবদের দাসত্ব আর স্বার্থের পাশা খেলার আফিম —–
রাধার আঁটসাঁট বাঁধা, আধা জীবন—
অন্তহীন অবিবেচনার বাঁশি সুর তোলে সময়ের লাম্পট্যে—-
আমি আর তোমার দিকে তাকাইনি বহুদিন—
তোমাকে পড়ার তৃষ্ণা তবু রয়ে যায়,
তুমি কি সিলেবাসের শেষ না হওয়া সেই পাঠসূচি?
পরিক্ষার পর পরিক্ষা পেরিয়ে যায়–
কেবল পড়া হয়ে ওঠে না আর—