রাফেজা

রাফেজা
মহি মুহাম্মদ
বদরডাঙা
সকালের আলো চারিদিকে। অনেক মানুষের হট্টগোল ভেসে আসছে। কয়েকজন লোক মিলে একজনকে পিটাচ্ছে। নির্মম। আর সবাই দাঁড়িয়ে তামশা দেখছে। কখনও কখনও মানুষ নিষ্ঠুরতাকে ভালোবাসে। নির্মমতা মানুষের ভেতরে কিভাবে ঘাপটি মেরে থাকে এদের না দেখলে বোঝা যায় না। লোকটির অসহায় চিৎকার সকালের বাতাস ভারি করে তুলেছে। যে মার খাচ্ছে তার নাম মুজাম। বেদম মার মারছে। হয়তো সে কোনো কিছু চুরি করেছে, নয় তাকে চোর সন্দেহ করা হয়েছে।
এ অঞ্চলের লোকগুলোর মনে রহমটহম কিছু নেই। রাগ উঠলে গরুছাগলের মতো মানুষ পেটায়। এ গ্রামেই মাঝে মধ্যে ছাল ওঠা কুকুর দেখা যায়। কারণ লোকেরা গরম পানি করে কুকুরের গায়ে ছুঁড়ে মারে। এ গ্রামেই একবার এক চোরকে খেজুরের কাঁটা দিয়ে চোখ তুলে নেওয়া হয়েছিল। সেই চোর আবার ভাতচোর। খিদার চোটে এক অকর্মণ্য ব্যক্তি প্রতিরাতেই এর ওর বাড়ি থেকে ভাত চুরি করতো। তাই একবার সোনাই মাতুববরের ঘরে ভাত চুরি করতে গেলে তাকে খেজুরের কাঁটা দিয়ে চোখ তুলে দেয়। সেদিন সকালে সবাই চোরের চিল্লানি শুনে মাঠে এসে দেখে চোরটা অমন করে চিল্লাছে। তারপর খোঁজ নিয়ে জানা গেল ভাত চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। সোনাই মাতুব্বর চকে টেনে নিয়ে গিয়ে খেজুর কাঁটা দিয়ে চোর ব্যাটার চোখ তুলে দিয়েছে। কেউ কিচ্ছুটি বলল না। না, কেউ না। এমন হৃদয় বিদারক আরো ঘটনা এখানে হরহামেষাই ঘটে। গ্রামটির মানুষের সঙ্গে সহজে কেউ আত্মীয়তা করতে চায় না। একটা গ্রামের মানুষ সকলেই কমবেশি এমন রিরংস হয় কি করে? বিষয়টি অভিশাপের মতো।
মুজামের বাপ নেই। মা আছে আধা পাগল। বোন ছিল। এখন কোথায় আছে সে জানে না। ঘরের অভাব স্বভাব নষ্ট করেছে। তাই বোন ঘরের বাইরে চলে গেছে। গেছে তো গেছে আর ফিরে আসেনি। মুজাম এর ওর ঘরে কাজ করে তবে সে ইশকুলে পড়ে। তো মুজামকে কয়েকজন পিটাচ্ছে কেন? হ্যাঁ পিটাচ্ছে এই কারণে সে চুক্তিভিত্তিক যে কাজটি নিয়ে ছিল তা নাকি ঠিক মতো করেনি। তাই পাওনা টাকা চাইতে গেলে বদরডাঙার ত্যাড়া মোনাই আর তার কামলারা ওকে পিটাতে শুরু করে। ওদের মুদ্দা কথা মুজামকে ওরা এক পয়সাও দিবে না। আর মুজামও এমনটা ভাবেনি। সে যে পরিশ্রম করেছে তার টাকা না নিয়ে সে একপাও নড়বে না বলে ঘোষণা দিলে ত্যাড়া মোনাই ক্ষেপে যায়। ওর মতো ছেলেকে টাকা না দিলে মোনাইয়ের কোন বালটা ছিড়া যাবে এই সে দম্ভ করতে থাকে। আর সবার সামনে যখন মুজাম টাকা আদায় করার জোর ঘোষণা দেয় তখনই তেড়ে আসে মোনাই ও তার কামলারা।
মাইর খেয়ে মুজাম এখন আরো জোরে জোরে চিৎকার করছে। সবাই তাকিয়ে দেখছে ব্যাপারটা কি? মুজাম একদিন এই টাকা শোধ নিয়ে ছাড়বে এমন ঘোষণা দিয়ে সবার সামনে থেকে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নেয়। মোনাই শেখও কম যায় না। সেও হুংকার ছাড়ে মুজামের ভিটায় ঘুঘু চড়াবে বলে ঘোষণা দেয়। এ পৃথিবীতে কে কার? কেউ কারো নয়! মুজামের ভেতরে একটা বোধ নাড়া দিয়ে ওঠে। এত ভালো হয়ে থেকে লাভ কি? এক শ্রেণির মানুষের শুধু টাকা পয়সা হয়েই যাবে। আর এক শ্রেণিরা শুধু কষ্ট পেয়ে যাবে? ভালো থেকে কি লাভ? তারচেয়ে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে। এ পৃথিবীতে যখন এসেছে তখন মরতেই হবে। মরার আগে মরে কি লাভ? বেঁচে থাকার চেষ্টা সব মানুষের করা উচিত। বারবার মরার চাইতে একবার মরা অনেক ভালো। তাই সে বেঁচে থাকার সব চেষ্টাই চারিয়ে যায়। ইশকুলে যেতে হবে তাকে মানুষের ফাইফরমাশ খাটবে সে আরো কতো কি! কিন্তু ইশকুলে পড়লে কি মুজাম তো পাশ করতে পারে না। পাশ না করলে সে একটার পর একটা শ্রেণিতে উঠবৈ কি করে? কিন্তু সে এভাবে উঠেতে থাকে। তাকে পড়াশোনা করতেই হবে। গরুর ঘাস কাটলে কেউ তাকে ফেন দেয় খেতে। কেউ হাট করলে দুটো পয়সা দেয় আবার কেউ গরের চালাটা ঠিক করলে এবলো ভাত দেয়। এই দিয়ে বুঝি আর মুজামের সংসার চলে না। আবার আরেক বিপত্তি সপ্তাহে একবার দুবার ইশকুলে গেলে মাস্টারের বেতের বারি তার পিঠে অসহ্য জ্বালা ধরায়। কিন্তু মনোজগতের পরিবর্তনটা সে ধরতে পারে মজিদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর। ক্লাস নাইনে যখন সে টেনে টুনে উঠে গেল তখন তার সহপাঠ সৈয়দ ওয়াউল্লাহর উপন্যাস ‘লালসালু’ ছিল একদিন মোটা জব্বারের কাছ থেকে বইটা এনে সে পড়তে শুরু করল। রাতে কুপির তেলের বারোটা বাজিয়ে সে বইটা পড়া শেষ করল তখন সে মজিদের মতোন হওয়ার একটা গোপন বাসনা টের পেল। মজিদের মতোন এমন প্রতিপত্তির মালিক হওয়ার জন্য তার ভেতরটা বেশ আনচান করে উঠল। আমেনা বিবির পা ভাবতে তার কতো দিন হাতের কাজ পরে থাকল তার শেষ নেই। এভাবেই সে স্বপ্নে মশগুল হয়ে থাকল।
তবে নারী শরীরের প্রতি টানটা তার দিন দিন বাড়তে লাগল। না হয় খোনকারদের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ পুকুরের দিকে চোখ গেলে সে অবাক না হয়ে পারে না। খোনকারদের বড় ছেলের বউ যে কিনা আনমনে শরীর ভিজিয়ে সাবানের ফেনা তুলছিল সেদিকে চোখ পড়তেই তার নিষিদ্ধ ভালো লাগা মরুর তৃষ্ণা নিয়ে ছুটে গেল। লুকিয়ে নারী শরীর দেখতে এত উত্তেজনা এই প্রথম টের পেল মুজাম।
দু’কানের পাশ দিয়ে গরম হলকা ছুটতে লাগল। কি করবে দিশে পেল না। ঠিক এই অবস্থাতেই সে চোখে পড়ে গেল খোনকারদের ছেলের বউয়ের। বউটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মুজামকে দেখে সে কোথায় শরীর ঢাকবে তা না। সে নির্লজেজর মতো তাকিয়ে রইল। হাত ইশারায় ঢাকল কি বউটা তাকে! বুঝতে অসুবিধে হলো তার। কি করবে বুঝতে পারল না।
ইশকুলে একদিন মাস্টার মশাই খুব মারলেন মুজামকে। পড়া পারে না আবার সে ফ্যাল ফ্যার করে তাকিয়ে থাকে। তাই মার খেয়ে মুজাম ইশকুল ছেড়ে চলে যবার সদ্ধিান্ত নেয়। সে পড়ালেখা ইতি টানবে। পড়ালেখা তার হবার নয়। তার জীবন এভাবেই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে কাটবে।
কিন্তু সে যেদিন সে বদরডাঙা ছাড়ল সেদনি খোনকারদের বাড়িতে একটা কেলেংকারি ঘটেছিল। সেদিন সন্ধ্যার মুখে বাড়ির বাইরে হঠাৎ খোনকারদের বড় বউ খোলা চুলে বাইরে এল। মুজাম আগেই দাঁড়ানো ছিল। গরুগুলো বেধে আসছিল বড় বউ তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। কি যেন বলবে হঠাৎ পাগলের মতো তাকে ঝাপটে ধরল। আর ঝাপটে ধরা মানে কিছুতেই সে ছুটতে পারছিল না। অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে সে পাথর হয়ে গেল। কি করবে? এটা কি মানুষ নাকি অন্যকিছু। ভয় করতে লাগল। আর তখনই বাড়ির পুরুষ মানুষের চোখে পড়ে গেল। এরপর শুরু হলো বেধড়ক মাইর। রশি দিয়ে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখল। বিচারে কি যে হবে কে জানে। এই গ্রামের সেই চোরের শাস্তির কথা মনে পড়ে মুজামের। খেজুর কাঁটা দিয়ে চোখ উপরে নেওয়ার কথা। তার ভয় হয় দোষ না করেও যদি এই শাস্তি হয় তার, তবে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। এখন কিছুই করার নেই। শক্তির কাছে সে অসহায়। মিথ্যের কাছে সে পরাজিত। এখানে জিততে হলে তাকে শক্তিশালী হতে হবে। খাবার না দিয়ে এভাবে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখলে শরীর অবশ হতে সময় নিবে না। কিভাবে নিস্তার পাবে এ কথা ভাবতে ভাবতে সে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ল। এক সময় আর কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না মুজামের। রাত গভীর হতে গভীর হয়ে এল। আশেপাশে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঠিক এমন সময় কার হাতের স্পর্শে যেন ঘুমটা ছুটে গেল। অন্ধকারে ছায়াটার অবয়ব বড্ড চেনা মনে হলো। শাড়ির আঁচলে মুখ ঢাকলেও তাকে চিনতে তার এতটুকু অসুবিধে হয়নি। এই নারীর পাগলামির জন্য আজ তার এমন নাজুক দশা। আর সেই কিনা আবার রাতের অন্ধকারে এসেছে তাকে মুক্ত করতে!
মানুষ কতোই না রঙ্গ জানে! মুজামের হাত খুলে দেবার পর। ছায়া নারী বলল, ‘বাঁচতে চাইলে পালাও।’
অন্ধকারের ভেতর ওই মুখের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামায়। আকাশে চাঁদ নেই। থাকলে হয়তো তার চোখমুখের মায়াবি ছটা দেখা যেত। মুজাম একবার ওই মুখ দেখার আশায় মুখ ফেরাতে চাইল। কিন্তু ঘাড়ে কোথায় যেন টান লাগল। যার ফলে ওই মুখ আর তার দেখা হলো না।
সে কন্ঠ আবারও হুকুম দিল, ‘পালাও, বাঁচতে চাইলে পালাও।’
মুজাম কি করবে? তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমারে ওরা মাইরা ফেলাইব। তুমি বাঁচবা না।’
নারী কণ্ঠ ম্লান হাসিতে ভরিয়ে তুলল রাতের বাতাস। বড় অদ্ভুত লাগল মুজামের কাছে। মুজামকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘আর কথা বাড়াইস না। যদি মরতে না চাস, পালা।’
দুই
নির্জীব পড়ে আছে মেয়েটি। চিৎ হয়ে। হাত-পা বিশ্রিভাবে ছড়িয়ে রেখেছে। বুকের কাপড় সরে গেছে একপাশে। দেখে মনে হয় প্রাণ নেই। স্থির। চোখ বন্ধ। ফ্যাকাসে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আছে। উপরের চালার টিন উড়ে গেছে। গাছের কিছু ডালপালাও এসে যত্রতত্র পড়েছে। চালার টিন উড়ে যাওয়ায় সকালের মেঘমুক্ত আকাশ উঁকি মারছে। মাজারের সালুকাপড়ের একপাশ উড়ে গেছে। তাতে মাজারের ক্ষত-বিক্ষত নগ্ন বুকটা ধনুকের পিঠের মতো উদোম হয়ে আছে। রাফেজার বুকে কাপড় ছিল না। মুজাম একে অন্যসময় হলে কি বলতো, তা ভাববার বিষয়। কিন্তু এখন এ দৃশ্যেও সে নির্বিকার। তার মুখে কোনো রা নেই। ভেতরে ভেতরে কি চলছে সে নিজেই বুঝতে পারছে না।
কাপড় টেনে ঠিকঠাক করে দেয় আম্বিয়া। পরনের কাপড়টা ভেজা। ঝড় এসেছিল রাতের শেষ পহরের দিকে। ঠান্ডা পরাতে ঘুমটাও পেয়েছিল মরার মতো। না হলে একটুও চেতন হলো না কেন? টের পেলে এত বড় সর্বনাশ হতে পারতো না। একটা জান যাওয়া কি সহজ ব্যাপার! কথাটা মনে হতেই মনটা ছ্যাৎ করে ওঠে। এই তো এখনো ধুকপুক করছে ধুকপুকিটা। আম্বিয়া হাতটা একটু মালিশ করে দেয়। সে কোনো কথা বলে না। অদূরে মুজাম দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো রাও নেই। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আম্বিয়ার কাণ্ড-কীর্তি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাড়িতে হাত বুলায়। দেখে আম্বিয়ার রাগ হয়। কিন্তু এখন রাগ প্রকাশ করার সময় না। এ ব্যাপারটি সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। কোমরে কাপড় প্যাঁচিয়ে নিয়ে রাফেজাকে পাঁজাকোলা করে আগলে নেয়। বুকের মধ্যে মিশিয়ে চেপে ধরে। তারপর একটু কোমরটা সোজা করে নিঃশ্বাস নেয়। থপথপ করে পা ফেলে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। ঘরে এনে বিছানায় আস্তে করে শুইয়ে দেয়। মুজাম পেছনে পেছনে আসছিল। আম্বিয়া ধমকে ওঠে।
‘যান অহন, বাইরে যান। আগে অরে ঠিক করি।’
কালরাতে রাফেজার আছর ছাড়ানোর জন্য মুজাম ওকে মাজারে বেঁধে রেখে আসে। রাতের শেষ পহরে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। শুধু বৃষ্টি নয়, শেষে শিলাও ঝরতে থাকে। মুজাম বলেছিল, ‘আল্লাহ পাপের শাস্তি দিতাছে। জমিনে নাফরমান বান্দাদের ওপর বোঝা বেশি ভারী হইছে। তার কিছু আলামত আকাশ থাইকা ঝরতাছে।’
চৌকাঠের ওপারে মুজাম থমকে দাঁড়ায়।
আম্বিয়া তাড়াতাড়ি ভেজা কাপড় টেনে খোলে। একটা কাঁথা রাফেজার দেহের ওপর বিছিয়ে দেয়। তারপর কুলুঙ্গি থেকে সরিষার তেল এনে হাতে পায়ে মালিশ করতে থাকে। শুধু তাই নয় রাফেজার মাথায়ও তেল বসিয়ে দেয়। বুকের মাঝখানে ধুকপুকিটা এখন জোরে জোরে উঠানামা করছে।
তারপরেও আম্বিয়া দৌড়ে গেল চুলার কাছে। গিয়ে চুলা ধরাল। রসুন তেল গরম করে এনে মালিশ করল ওর বুকে। শিকায় রাখা দুধের ডেকচি চুলার ওপর বসাল। গরম দুধ করে এখনি মেয়েটাকে খাওয়াতে হবে।
মুজাম দাওয়ায় বসে কি যেন ভাবে। হয়তো তার পরবর্তী পদক্ষেপ। বাঁশঝাড় ভেঙে পড়েছে। মনে হচ্ছে কে যেন জোর করে কুর্ণিশ করতে বাধ্য করেছে। অবাধ্য কঞ্চিগুলো কেমন হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে। সালুকাপড়টি সরে গিয়ে বিধ্বস্ত মাজারটির উদোম পিঠ দেখা যাচ্ছে। মাছের বাঁকা পিঠের মতো মাজারটির বুক থেকে এক খাবলা মাটি উড়ে গেছে। আগের মসৃন ত্বক সরে গিয়ে হলুদ পোড়া মাটির ইট মুখ ভেংচে তাকিয়ে আছে। প্রকৃতি উলট-পালট হয়ে পড়েছে। আর সালুটিও কেমন ম্লান হয়ে পড়েছে। নতুন কাপড় লাগানো প্রয়োজন। লাল রংটি ঝলসে গেছে। খাবলা খাবলা রং জ্বলে গেছে। নতুন কাপড়ের রঙের জৌলুস আলাদা। লোকের মন আকর্ষণ করবে। ভক্তি শ্রদ্ধা বাড়াবে। রঙেরও অদ্ভুত শক্তি। এদিকে রাফেজাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে তোলা দরকার। লোকজন যেন মুজামের এমন নিষ্ঠুর কর্মটির সমালোচনা করতে না পারে। তাই সে আম্বিয়াকে তাড়াও দিয়েছে। কিন্তু আম্বিয়াকে তাড়া না দিলেও চলতো। ও নিজেই ব্যতি-ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। দেখে মনে হচ্ছে ওরই কিছু একটা হয়েছে। রাফেজাকে সে মায়ের পেটের বোন মনে করে। তাকে ঝড়ের আগে ধেয়ে চলা ভীত রমণী মনে হচ্ছে।
ঝড়ে পড়া বৃক্ষের মতো মুজামের ভেতরটা এলোমেলো হয়ে ওঠে। কিন্তু সেটা বাহির থেকে বোঝার উপায় নেই। উপরে যেমন সে কঠিন তেমনি ভেতরটাও তার কাঠিন্যে ভরপুর। আম্বিয়ার হাবভাব ভাল ঠেকছে না। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বেঁকে বসবে। মাঠের ধান তছনছ হয়েছে। গাছ-টাছও উপড়ে পড়েছে। অনেকের বাড়ি-ঘরের আব্রুও বের হয়ে পড়েছে। তাই কাউকেই এই মুূহূর্তে ফাকা পাওয়া মুশকিল। সবাই ব্যস্ত ক্ষেত-খামারিতে। মুজাম নিজে গিয়ে দুজনকে ডেকে আনল। বাড়ির চাপশের বেড়া চিৎ-কাৎ হয়ে পড়েছে। ঠিক না করলে পথ থেকে অন্দরের সবকিছু দেখা যায়।
তখনও রাফেজার সাড়া নেই। এই অপকর্মের জন্য মুজামকে দায়ী করে আম্বিয়া। মুজাম তাজ্জব বনে যায়। আম্বিয়ার মুখে এই প্রথম এমন কড়া কথা শোনে সে। ‘মানুষ না জালেম’ শব্দটা ঘুরে ফিরে তার কর্ণকুহরে ধাক্কা মারতে থাকে। তখনও মুজামের বিশ্বাস হচ্ছিল না। আম্বিয়া এত বড় কথা বলতে পারে! সে অতর্কিতে আম্বিয়ার মুখে একটা থাবড়া বসাল। আম্বিয়া নাকে মুখে ব্যথা পেলেও কাঁদল না। আম্বিয়ার চোখে পানি নেই। আম্বিয়া যেন খটখটে ডোবা। মুখটা পাথরের মতো হয়ে আছে। ধুপধাফ পা ফেলে চটজলদি কাজ করছে। এখন তার পায়ের শব্দ নিয়ে মুজাম কোনো বাক্য ব্যয় করল না। কাছে এসে বলল, ‘বিবি মুখখান অমন কইরা ভার কইরা রাখছ ক্যান?’
‘তয় কি করব? মুখে রং মাইখা ঢং করব?’
‘আস্তাগফিরুল্লাহ নাউজুবিল্লাহমিন জালেক। এভাবে কথা বলছো কেন? আদব লেহাজ ভুইল্লা গেলানি!’
‘তা ভুলব কেন? ভুললে এতদিন মুখ বুইজা এই মরার ঘানি টানলাম কেমনে?’
মুজাম এক এক করে শুধু বিস্ময় হতেই থাকে। এ কোন আম্বিয়া? শত চড়েও যে রাগ করে না। আজসে একটু খোঁচাতেই গুক্কুর নাপের মতো তেড়ে উঠছে!
‘মরার ঘানি মানে কি বিবি? আইজকাল বেশ শক্ত শক্ত কথা কইতাছ দেখছি! কোন আছড় পড়ল আবার তোমার ঘাড়ে। আমি কিন্তু আছড় ছাড়াইতে জানি। দেখছ তো ছোটটারে আছড় ছাড়াইছি। বেশি বাড় বাইড়ো না কইলাম, আমি বাড়াবাড়ি সহ্য করি না।’
কিন্তু আম্বিয়া তার কথার কোনো জবাব দিল না দেখে মুজামের ভেতরটা জ্বলতে থাকল। ইচ্ছে করল একটা চেলা কাঠ ওর পিঠে ভেঙে দেয়। বেয়াদ্দপ মেয়ে ছেলেকে এভাবেই শিক্ষা দিতে হয়। না হয় সে আরো বেশি করে স্বামীর অবাধ্য হতে থাকে। ক্রোধে শরীর, মন জ্বললেও ইচ্ছেটাকে পূরণ করা গেল না। তাই কেমন মেন্দা মেরে বসে থাকল মুজাম। তাকে ঘিরে একটা মুরগি ছানাপোনা সহ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
মুফত জন খাটার কাজে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়েছিল তাদের বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে বেড়ার কাজ করতে নির্দেশ দিল মুজাম। লোকগুলো কাজে লেগে গেল। ওদিকে রাফেজার কি অবস্থা সে খেয়াল করতে আবার ভেতরে এল মুজাম। আম্বিয়ার দু’চোখে হঠাৎ করে কঠিন অবিশ্বাসের ছায়া লক্ষ করছে মুজাম। তবে এর বিহিত সে আরো পরে করবে। এখন না। এখন ভালোয় ভালোয় রাফেজা সুস্থ হয়ে উঠুক। না হলে গ্রামের মানুষ তাকেই অপবাদ দিতে পারে।
মুজাম গ্রামের পথে ছুটল। গ্রামের মানুষের দুঃখের দিনে কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। অসহায় মানুষগুলোর পাশে না দাঁড়ালে নাফরমানি করা হবে। আর ওরা তাকে সন্দেহও করতে পারে। মনে সংশয় নিয়ে বিশ্বাস প্রতিস্থাপন করা যায় না। তাই সে ছোটে। এ ছোটা তার নিজের তাগিদে, নিজের অস্তিত্ব আরো সমুন্নত রাখার জন্য। বিস্তৃত প্রান্তরের পথে হাঁটতে গিয়ে গত রাতের শিলাবৃষ্টির দাপট চোখে পড়েছে।
‘ইশ, সর্বনাশ হইয়া গেছে!’
এ ধরনের আফসোস মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মাঠে পাকা ধানের শূন্য ছড়াগুলো কৃষকের কষ্টের শীষ হয়ে মৃদু বাতাসে ম্লান বদনে তাকিয়ে আছে।
মুজাম শব্দ করে বলল, ‘সবই আল্লাহপাকের নেক ইচ্ছা। তুমি মারো, তুমিই বাঁচাও। সবই তোমার কুদরত, হে রহিম রহমান।’
তিন
একটা ঝড়ের আভাস সন্নিকটে। মানুষগুলোর মধ্যে কেমন একটা আউলাঝাউলা ভাব ভর করে আছে। কতিপয় যুবক মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। শহর থেকে এল্ম শিখে যুক্তির শানানো ছুরি চালাচ্ছে। লোকজনকে সেই কথায় কাৎ করে ফেলছে। গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা বুঝি সে আর রোধ করতে পারল না। এসব কর্মকাণ্ড ঠেকাতে না পারলে তার অবস্থা বেগতিক হবে। ছোট লোকগুলোর চোখে আলোর দিশা ঢুকে গেলে মুখে মুখে তর্ক করবে। নানা অজুহাতে আর মাজারমুখী হবে না। আল্লাহর রাস্তা থেকে সরে যাবে। প্রভাব প্রতিপত্তি হারালে ছাগলেও মুছবে না তখন। সময় চলে গেলে কিছুই হবে না। তাই মুজাম ওদের ভড়কে দিতে চায়। সবার আগে আক্কাসের দলটাকে সে ভেঙে দেবে। আস্তে আস্তে শিকড় পোক্ত হলে উপড়ানো কঠিন হবে। নরম মাটি থেকে গাছ উপড়ানো সহজ। কিছুতেই সে ওদের অভিসন্ধি সফল হতে দেবে না। আলতাফের বন্ধু কুদ্দুস আর ফয়সল। ওরা চাচ্ছে গ্রামে একটা স্কুল ঘর হোক। এবং এখন ওরা অনেকেই এক জোট। তাই স্কুলের বিরুদ্ধে মুজামের মনগড়া কথা আর ধোপে টিকবে না। তার খাস মুরিদ যারা আছে ওদের দিয়ে ভেতরে ভেতরে প্রচারণা চালাতে হবে। মুখডোবাকে সুখী, সমৃদ্ধ গ্রাম করতে চায় আলতাফ। দাঁড়া বেটা তোর সুখি সমৃদ্ধ গ্রাম বানাই। চক্র ভাঙতে হবে। চাক বান্ধার আগে যদি ভাঙতে পারে তাহলে সফল হবে, না হয় অসুবিধা হবে পদে পদে।
‘হে মহান রাব্বুল আলামীন, শক্তি দাও। এই নাদান নালায়েক বান্দাদের বিরুদ্ধে লড়বার শক্তি দাও। ওদের শয়তানি বুজরকি ভাঙবার তৌফিক দান কর। আমীন’ Ñ বলে মনে মনে মুজাম নিজে নিজেই শক্তি অনুভব করে।
অবশ্য মালেক মেম্বার তার হাতে আছে। কিন্তু থাকলে কি হবে রাহেলা বিবির সন্তান না হওয়ায় মেম্বার মনে মনে গোস্বা। কিন্তু যে দুরভিসন্ধি মনে মনে মুজাম করেছিল তা সফল হলে এতাদিনে রাহেলা বিবির কোলে একটা ফুটফুটে সন্তান হয়ে যেত। তার চালে একটু ভুল হয়েছে। ঠিক মতো ঘটনা না সাজালে যা হয় আর কি! তবে একবার ভুল করেছে আর না! এবার ঠিকই সে রাহেলার কোল আলো করে সন্তান দিয়ে মালেক মেম্বারকে পুরো কিনে নেবে। রাহেলার কথা ভাবতে ভাবতেই রাহেলা এসে হাজির হয়েছে। এবার তাই আর ভুল করল না মুজাম। বুঝিয়ে দিল এশার ওয়াক্তের পর তিন দিন কিভাবে আসতে হবে। নিশ্চিত করে বলল এবার আর ভুল নেই। ফরিদকে দিয়ে কিছু আফিম আনিয়ে রাখল মুজাম। অন্ধকারে মাজার ঘরে তার দেওয়া মন্ত্র আর পথ্য পর পর তিন দিন নিয়ে গেল রাহেলা বিবি। মুজাম পরিতৃপ্ত হয়েছে। শেষ দিন বলল, ‘এবার আর ভুল হয় নাই। কিছুদিন অপেক্ষা কইরা খুশির খবর জানাইয়া যাইয়েন।’
সালুকাপড়ে ঢাকা মাজারটির দিকে মরা মাছের মতো চোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকল মুজাম। অজানা অচেনা কবরটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে নতুন উপায় বাতলানোর নকশা আঁকতে চায়। মনে হয় কবরের ভেতর থেকে কে যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তাকিয়ে তাকিয়ে তার জন্য অভিশাপ দিচ্ছে। কিন্তু সে তার জন্য দোয়া খয়রাত করা ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। তার মন অচেনা সেই শক্তির জন্য ভক্তি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়। তার নাম যাই হোক না কেন, সে যেই হোক না কেন, তার জন্য অসীম দোয়ার বরকত নাযিল হওয়ার জন্য কায়মনে হাত তোলে। হে গফুরুর রাহিম…।
স্কুল নির্মাণ করছে আলতাফ। এ খবর পাওয়ার পর স্থির থাকতে পারছে না সে। ভাবনায় ডুবে আছে। কেমন করে আলতাফকে নিরস্ত্র করা যায় ভাবছে। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে আরো কজন যুবক। মালেক মেম্বার নিশ্চুপ। তার কথায় তেমন সাড়া দেয়নি। রাহেলা বিবির তালাক হয়নি। ধর্মের জোর কি তবে কমে গেল। তার ওপর কি লোকজন তাওয়াক্কল রাখতে পারছে না? তাকে না জানিয়ে কোনো বাড়িতে মাইক বাজছে? এমন তো হওয়ার কথা না। খবর নিতে হবে। এত বড় দুঃসাহস কেমনে হয়! তবে মুজামের মনে হয় বজ্র আঁটুনি ফসকা গ্যাড়ো। বেশি লোক ক্ষেপিয়ে কাজ নেই। যুগ পাল্টাচ্ছে। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। লোকজন কিছু বাইরে যাবেই। সবাইকে দলে পাওয়া যাবে না। তবে বেশি যেন বাইরে না যায় তার জন্য কাজ করতে হবে। মুজামের ওপর কি আস্থা কমে গেল! আস্তে আস্তে এই মুখডোবার মানুষগুলো তার ওপর কি অনাস্থা প্রকাশ করবে? তাকে কেউ কি আর মান্যি গন্যি করবে না? হাজারো চিন্তার করাল স্রোত তার মাথা উষ্ণ করে তুলল।
ঘুরে ফিরে আবার আলতাফ এসে ভর করল মাথায়। আলতাফ এবার কোনো ভুল করবে না। গ্রামের মানুষগুলোও পাল্টাচ্ছে। ধর্মের কথায় চোখে জল আনে ঠিক ভেতরে ভেতরে ধর্মের বাইরেও যেতে এদের বাধে না। রেডিও টিভির কল্যাণে এদের চিন্তা- চেতনা বেশ তর তর করে এগুচ্ছে। শুধু কি তাই মোবাইলের কল্যাণেও খবরা-খবর দ্রুত ছড়াচ্ছে। যার কারণে কাউকে দীর্ঘদিন কোণঠাসা করে রাখা যায় না। স্কুল ঘরটি রাতারাতি উঠে যাচ্ছে। মুজাম তার সঙ্গী ফরিদকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একটু দেখে না আসলে এর অবস্থান আবার তাকে কোন বিপদে ফেলে কে জানে। স্কুল ঘর নয় যেন ওটা শয়তানের ঘর। শয়তানকে আটকাতে হলে ওই ঘরটা দেখে আসা দরকার। ফরিদকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মুজাম। আলতাফের স্কুল ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। আলতাফ তখন চালার ওপর ছাউনি দিচ্ছে। সে নিজেই ঘরামি সেঝেছে। মুজাম গলা উচিয়ে বলল, ঘরের চালা শক্ত কইরা বাধো মিয়া। উটকো হাওয়ায় না উইড়া যায়!
আলতাফ বেতের বাঁধ দিতে দিতে বলে, ‘না হুজুর, উড়ব না। বেতির জোর আছে। পানিতে ভিজাইয়া পোক্ত করছি। হাওয়ারে পাত্তা দিব না।’
মুজামের সুরমা দেওয়া চোখ ইতিউতি ঘোরে। দশ বারোজন ছেমড়া টাইপের তরুণ আলতাফের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এদের মনের শক্তি কতটুকু তা দেখে সে আলাই করতে চেষ্টা করল। ধমক ধামকে এদের মনের জোর ভেঙে পড়বে কিনা আর তাতে কতটুকু কাজ হবে তা সে বুঝতে চেষ্টা করল। দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে সে এক তরুণকে জিজ্ঞেস করে, ‘কি মিয়া তবন ক্যান এত্তো উপরে উঠাইছো? গুনাহগার হইবা তো!’
‘হুজুর কামের সময় অতো কতা কইয়েন না। তপন নিচে ল্যাছরায় তো কাম করবো ক্যামনে? নিচে কতো হিয়াল কুত্তার গু তহন তপন নষ্ট হইব না?’
‘আরে মিয়া আমি তোমারে ভালা কথাই তো কইছি।’
মুজামের চামচা ফরিদ বলে উঠল, ‘হ হ মিয়া তোমারে কি খারাপ কথা কইছে? তপন ঠিক করো।’
আলতাফ উপর থেকে হুজুরের কথা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, ‘হুজুর আমাগো স্কুলের শুরুর দিন আইসেন, ‘জিলাপি মুড়ি খাইয়া যাইয়েন।’
অন্যেরা আলতাফের কথা শুনে হাসি ঠেকিয়ে রাখতে পারল না। মুজামের মুখ আষাঢ়ের আকাশ বানিয়ে বলে উঠল, ‘লা হাউলা অলা কুওয়াতা…।’ এই বলে সে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। সে এখানে বেশি কথা বলে আর বেইজ্জত হয়ে লাভ নেই! এখনকার ছেলেমেয়েগুলো কারে যে কি বলে ঠিক নাই। এইগুলান আস্তে আস্তে বেবাকে বেয়াদ্দপ হইয়া যাইতেছে। আল্লাহ তুমি ঈমান দাও। চোখ বন্ধ করে এই নালায়েক বান্দাদের শাস্তি কামনা করে মুজাম। বিড় বিড় করে ফরিদকে বলেন, ‘ফরিদ মিয়া, তাড়াতাড়ি পা চালাও, আমারে রইস মিয়ার বাড়িতে যাইতে হইব।
মুজাম হাতের লাঠি আগ বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। ফরিদ মিয়া যতটুকু পারে ছাতির ছায়ায় হুজুরকে রাখতে চেষ্টা করে। এর জন্য তাকে হুজুরের পেছনে পেছনে ছুটতে হয়। আবার কখনও তিড়িং তিড়িং করে লাফাতে হলো। মুজাম হাঁটছে ঠিক কিন্তু তাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। গভীর চিন্তার জন্য তার হাঁটার গতিও শ্লথ। সে এই মুহূর্তে চিন্তা করছে কিভাবে আলতাফকে কোণঠাসা করা যায়। একটা তেলেসমাতির খেল খেলতে হবে। না হয় এই পোলা তার সর্বনাশ ডেকে আনবে। সেই যে তার দাড়ি ওঠা ও কলেমা জানা নিয়া সবার সামনে কোণঠসাসময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন বদলায়। যতটুকু ওয়াজ নসিহত করে সে লোকজনের মনে খোদার ভয় ঢুকিয়ে ছিল আলতাফ তা এক লহমায় উড়িয়ে দিতে পারবে না। এই পৃথিবীতে দাপটের সঙ্গে থাকতে না পারলে থাকার মানে নাই – এই ভাবনা মুজামকে সারা পথ মশগুল করে রাখল। তাই আচমকা খাল পারে এসে তাকে থমকে দাঁড়াতে হল।
একটা বাঁশের সাঁকো খালটাকে এপারওপার সংযুক্ত করেছিল। বর্ষাকালে খাল ভরে গেলে তখন খেয়া পারাপার করতে হয়। এখন অগ্রহায়ণ,পৌষের সময়। তাই খালে জল কম। আর এ সময়ে খালটাকে এপাড়-ওপাড় জুড়ে দেওয়ার জন্য মোটা বাঁশের সাঁকো তৈরি হয়। এখন সেই সাঁকোর কাজ মেরামত হচ্ছে। লোকজন সব হাঁটুজল পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুজাম এভাবে হাঁটুজল পার হতে কতো কি যে ভাবতে লাগল তার ইয়ত্তা নেই। কারণ এই হাঁটুজল অতিক্রম করতে হলে তাকে হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলতে হবে। এই কাজটি করতে মনে মনে সে সায় পায় না। তাছাড়া কেউ একজন দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ আগেই এ নিয়ে সে জ্ঞান বিতরণ করে এসেছে। দক্ষিণে তাকাল সে, বেশ কয়েকজন সাঁকো মেরামত করছে। মুজাম দাড়িতে হাত বুলিয়ে ফরিদের উদ্দেশ্য বলল, ‘খাল পার হই কেম্বায়?’
ফরিদ প্রভুভক্ত কুকুরের মতো নতজানু হয়ে বলল, ‘মনে চিন্তা নিয়েন না হুজুর। আপনি কিছু মনে না নিলে একখান কতা কই?’
মুজাম ফরিদকে আশ্বস্থ করলে সে বলে, ‘আপনি আমার পিঠে সওয়ার হন। এইটুকু পথ আপনেরে আমি অনায়াসে পার করতে পারমু।’
মুজাম চারপাশে তাকাল, চারদিকে কে,ন একটা খাঁ খাঁ শূন্যতা বিরাজ করছে। তারপর একটু ভেবে বলল,‘ না তুমি আমারে নিতে পারবা না। খালের মাঝখানে গেলে পইরা যাবা।’
এ কথায় ফরিদ মন খারাপ করে। কারণ তার মুখের আলো দপ করে নিভে যায়। ছাতাখানা বগলে চেপে মাথার টুপিটা খুলে আরেকবার ফুঁ দিয়ে ঠিক করে পরে নেয়। চিবুকের ডগায় যে দু তিনটা দাড়ি আছে মনের আক্ষেপ মিটাতে ওতেই টানাটানি করে বলে, ‘হুজুর তয় কেম্বায় পার হইবেন?’
মুজাম চুপ মেরে থাকল। তখন দক্ষিণ দিক থেকে আওয়াজ দিল একজন।
‘কি মিয়া ফরিদ ভাই, হুজুর যাইব কই?’
‘হুজুর যাইব কৈয়াগ্রামে। রইস মিয়ারে দেখতে। হের খুব অসুখ। যে কোনো সময় এন্তেকাল করতে পারেন। মনে অনেক আশা নিয়া হুজুররে স্মরণ করছেন। ভক্তের আশা কি হুজুর পূরণ না কইরা পারেন?’
এতগুলো কথা একসঙ্গে বলে ফরিদ মিয়া হাপাতে লাগল। আর কথাগুলো বলতে পেরেও নিজের কাছে বেশ তৃপ্তি মনে হল।
মুজাম একটু কড়া দৃষ্টিেেত ফরিদের দিকে তাকাল। ফরিদ বুজতে পারল তার এতো কথা বলা ঠিক হয়নি। যে লোকটি এত কথা জিজ্ঞেস করছিল, সে এবার কাছে এগিয়ে এল। এসে নতজানু হয়ে মুজামকে সালাম করল। তারপর বিনীতভাবে বলল, ‘হুজুর এই গুনাগার বান্দারে যদি সুযোগ দেন, তয় আপনারে এই খালডা পার কইরা দেই।’
মুজাম বলল, ‘ওরে বেত্তমিজ, তুমি পার করানোর কে? আমার দয়াল চান্দের কৃপা হইলে তয় না আমি পার হব।’
লোকটি শরমিন্দা হয়ে মরমে মিশে যেতে চাইল। বেফাঁস কথা বলে সে বুঝি মহাঅন্যায় করে ফেলেছে। তাই মুখখানা কেমন চুপসে গেছে। অথচ মনে হয়েছিল হুজুর এতে খুশি হয়ে তাকে বেশ দোয়া দিয়ে দেবেন।
‘হুজুর মাফ দিয়েন এই অধমেরে। আমি কি আপনার কোনো কাজেই লাগলাম না?’
মুজাম কি জানি ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘রহ বেটা, রহ। ইজাজত পাইছি। আইসো।’
লোকটির চেহারা রোদে পোড়া । চোয়াল ভাঙা। মুখে নানা বলিরেখা কাটাকুটি। দাঁতগুলো পাকা কদুর বিচির মতো। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
মুজাম কি যেন চিন্তা করল। কালো গাট্টা গোট্টা লোকটা বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘হুজুর কি এত চিন্তা করেন আপনারে ফেলাইতাম না। নিজে পইড়া যামু তয় জীবন দিয়া হইলেও আপনেরে রক্ষা করমু।’
মুজাম বলল, ‘নাম কি মিয়া, নামাজ-রোজা করো তো?
লোকটি হতভম্ব হয়ে গেল। মনে মনে কিছু ভাবল। হয়তো ভাবল নামাজ রোযা না করলে হুজুর তার পিঠে চড়বেন না।
তাই সে বলল, ‘আমার নাম হাসমত হুজুর। নামাজ রোজাতো করি হুজুর। আপনার মাঝারেও যাই। পতি শুক্কুর বার আপনার মাজারের মসজিদে নামাজ পড়তে যাই।’
মুজাম এদিক ওদিক তাকিয়ে নিল। ফরিদ উশখুশ করছিল, হুজুর কেন এত গড়িমসি করছে ভেবে পাচ্ছে না মনে হয় । এদিকে তর তর করে বেলা বাড়ছে। রোদের জিলজিলানি চোখ টানছে। বাতাসে হিম হিম ভাবটা মাঝে মধ্যে ধাক্কা মারছে। এ বছর অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ার দরুণ শীতটা নামি নামি করেও নামছে না। তবে বাতাসে তার রেশ ঝরতে শুরু করেছে। গা-হাত-পা টানতে শুরু করেছে। হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে ঝপাৎ করে শীত এল বলে!
মুজাম বলল, ‘আইস কাছে আইস।’
লোকটি ভক্তি দেখিয়ে কাছে এসে ধনুকের মতো পিঠবাঁকা করে দাঁড়াল। মুজাম পীর-মুর্শিদের নাম নিয়ে লোকটির কাঁধে ঝুলে পড়ল। কিন্তু তারপরেও মুজামের পা দুখানি খালের পানিতে ভিজে গেল। ঠিক তখনি মুজাম দেখতে পেল। তার সাগরেদ ফরিদ আলি হাঁটুর ওপরে লুঙ্গি তুলে খাল পার হয়ে আসছে। ফরিদ মিয়া দাঁত বের করে হাসছে। দোক্তা দিয়া পান খাওয়া লালটুকটুকে দাঁতগুলো অদ্ভুত মনে হচ্ছে। …
রইসের অবস্থা তেমন ভালো না। পেট ব্যথা ভালোই হচ্ছে না। যা খাচ্ছে তাতেই পেট মুচড়ে উঠছে। মুজাম পানি পড়ে দিল। তারপর কিছুক্ষণ রইসের পেটে হাত দিয়ে বসে রইল। রইসের বউ হুজুর আশায় বেশ আশান্বিত হয়েছে। আবডাল থেকে হুজুরের সঙ্গে কতা বলছে। মুজাম বুঝতে পারছে, যে কথা বলছে সে বিচক্ষণ মহিলা। সুন্দর উচ্চারণে সে সুন্দরভাবে সম্ভাষণ করতে জানে। না জানি সে দেখতেও কতো সুন্দর। মাশাআল্লাহ! মুজামের কল্পিত চোখে অচেনা নারীর রূপ কল্পনা করতে গিয়ে সেখানে মালেক মেম্বারের সহধর্মিনী রাহেলার সুন্দর পায়ের দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখে। যা হোক, রইসের বাড়ি থেকে বিদায় নেবার সময় কালো মুরগি আর গাছের কচি ডাব পাওয়া গেল। সেগুলো নিয়েই মুজাম আর ফরিদ বেলা-দ্বিপ্রহর হওয়ার আগে রওয়ানা করল।
চার
সে ছোটে, আর ছোটে। যত ছুটতে পারে ততই যেন লাভ। কখনো ক্ষেতের আইল দিয়ে কখনো রাস্তা দিয়ে কখনো চক দিয়ে আবার কখনো ফসলের ক্ষেত দিয়ে। পথ তাকে আজ বের করে এনেছে। তাকে অনেক দূর যেতে হবে। ভাগ্যবিড়াম্বিত মুজাম আজ ভাগ্যের অন্বেষণে বেরিয়েছে। এখন তাকে আস্তে আস্তে চালাক হতে হবে। লোক ঠকানোর কাজটি তাকে ভালো করে রপ্ত করতে হবে। এ পৃথিবীতে কে কার! বেঁচে থাকাই জীবন। হেরে যাওয়ার নাম মৃত্যু। নিজেকে দার্শনিক মনে হচ্ছে তার। খোদার এত বড় দুনিয়ায় একেকটা মানুষ একেক রকম। সবাই তো বেঁচে আছে। পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে। সেও টিকে থাকবে। এত সহজে রণে ভঙ্গ দিয়ে জীবন থেকে পালাবে না। যারা পালায় তারা ভীরু, কাপুরুষ। সে মানুষ। সে পুরুষ। সে লড়াই করবে।
রাতের প্রসববেদনা শুরুর হওয়ার আগেই সে গায়ের সীমানা ত্যাগ করে। আর যখন পুব আকাশে লাল বলের মতো সূর্যটা উঁকি মারে তখন সে অচিন গাঁয়ে। একটা বাজারের মধ্যে এসে সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা চা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালে সে দেখতে পায় এক বুড়ো লোক অনেক কষ্টে একবার পিঠা বানাচ্ছে আরেকবার চা করে দিচ্ছে। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে লোকটির কাণ্ড-কারখানা দেখল। তারপর লোকটার হাতা থেকে জোর করে খুন্তিটা কেড়ে নিয়ে বলল, তুমি চা বানাও আমি এটা সামলে দিচ্ছি। চালের গুরোর কাঁই একটা মালার ওড়নের মধ্যে পরিমাণ মতো নিয়ে তারপর খোলার ওপর দিতে হয়। তারপর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলে তা বেশ ফুলে পিঠা হয়ে যায়। তারপর গরম গরম ওগুলো লোকদের পরিবেশন করতে হয়। কেউ খাচ্ছে চা দিয়ে আবার কেউ খাচ্ছে ইছা মাছের ভর্তা দিয়ে। বুড়ো মিয়া মুজামের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। মুজাম যদিও ক্লান্ত পেটে ক্ষিদের রাক্ষস ছুটেছে তারপরেও সে পিঠা বানাচ্ছে। এর শ্রমের বিনিময়ে খাবার তো জুটবেই। কিন্তু একটা স্থায়ী সমাধান তাকে করতে হবে। থাকার জন্য একটা মাথা গোজার ঠাঁই তার বড্ড প্রয়োজন। জায়গার অভাব নাই কিন্তু তার থাকার মতো জায়গা এ্ পৃথিবীতে নেই। যখন লোকজন কমে গেল তখন লোকটা তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুই কিডারে? কই থাইকা আইলি আর কই যাবি?’
‘চাচা, আমি কেউ না। আমার কেউ নাই। হাঁটতে এই অচিন জাগায় আইলাম। আপনেরে দেখলাম কষ্ট করতাছেন তাই সাহায্য করলাম।’
‘ও.., তা থাকবিনি? যাওনের যহন জায়গা নাই তহন থাইকা যা। আবার মন চাইলে চইলা যাবি। ধইরা রাখুম না।’
মনে মনে কি যেন হিসেব করে মুজাম। ওর যেন কত কাজ। কোথায় যেন যেতে হবে। তাই দেখে আবার বুড়া মিয়া বলল, ‘কি গো পোলা কি ভাবতাছো?’
‘না চাচা, কিছু না। ভাবতেছি তোমারে কিছুদিন সাহায্য করতে পারলে ভালা হইতো।’ তারপর কি যেন ভাবে সে। ভাবতে ভাবতে হাতের কাজ ঠেলতে থাকে। দোকানে তখনও দু একজেন কাস্টমার রয়েছে।
বুড়ামিয়া ঘুরে ঘুরে মুজামের কাজ দেখে। ওর হাতের নিপুন কৌশল। একটু লোকজন সরে গেলে বুড়া মিয়া ভালো করে ওর চোখের দিকে তাকায় সেখানে আঘাতের চিহ্ন। বুড়া মিয়া ওর রক্ত জড়ানো কাপড়চোপরের দিকে তাকায়। তাড়াতাড়ি ওকে খেতে দেয়।
মুজাম খায়। আর একটা উদাস উদাস দৃষ্টি নিয়ে চারপাশে তাকায়। নতুন জায়গায় এসেছে সে। আরো কত ঘাটের পানি খেতে হবে তাকে কে জানে! তবে যেখানেই যাক সে নিজের মতো করে থাকার জায়গা যতদিন না পাবে সে ততদিন তার পথ পরিক্রমা ফুরোবে না। তবে আপাতত এই বুড়োমিয়ার কাছেই সে থেকে যাবে। একটু নিজেকে শক্ত করতে হবে। হয়তো বাজারের কাছেই বুড়া মিয়ার গ্রাম হবে, সেখানে যদি বসবাসের উপযোগী হয় তাহলে থেকেও যেতে পারে না হয় আবারও ছুটতে হবে তাকে। তবে এবার সে আর ভালো মানুষি করবে না। এবার নিজের করে পেতে হবে সবকিছু।
বুড়ামিয়ার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মুজাম আস্তে আস্তে পিঠার দোকানের টাকা সরাতে থাকে। তার গোপন তহবিল বাড়তে থাকে দিনে দিনে। তার ভেতরে টাকার নেশা ধরেছে। টাকা না হলে পতিপত্তি না হলে কিছুই সম্ভব না। একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তার বের করতে হবে। বুড়ার কুঁড়েঘরে বুড়ির ক্যাটক্যাট বুড়াই সহ্য করতে পারে না। আর তার এসব ভালোও লাগে না। বুড়ির মনে হয় মুজামকে পছন্দ করে না। মুজামকে জায়গা দিয়েছে বলে বুড়ি সারাক্ষণ বুড়াকে শাপশাপান্ত করে। তাই মুজাম এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। কিন্তু একটু টাকা পয়সা জমিয়ে নিয়ে তারপরেই এখান থেকে যেতে চায়।
মুজামের হাতের ছোঁয়ায় বুড়ার পিঠার দোকান বেশ চালু হয়। আর বুড়াও খুশি ছেলেটা চটপটে। কাজকাম তাড়তাড়ি শিখে নিতে পারে। এখন বুড়া যেদিকেই যাক মুজাম একাই দোকান চালাতে পারে।
পাঁচ
ভোরের বাতাসে শিশুদের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। খালি পেটেও মানুষের বাচ্চারা এমন চিৎকার দিতে পারে। মাজার প্রাঙ্গন শিশুকণ্ঠে সরব। গলার ভেতর যতো শক্তি আছে সব যেন উজার করে দেয় ওরা। শিশুদের স্বরে স্বর মিলিয়ে সেও সুরেলা কণ্ঠে পড়তে থাকে। পড়তে পড়তে অন্তরে ভক্তি ভাবের জোয়ার ঠেলে ওঠে। ভোরের বাতাসে অদ্ভুত এক জগতের মধ্যে যেন সে চলে এসেছে। তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে এই নবীনরাও একদিন তার দলে যোগ দেবে বলে বিশ্বাস রাখে সে। অগুণিত মানুষের মধ্যে বসে সে তাদের পরকালের কথা বলে চোখে জল এনে ফেলছেÑএই দৃশ্য সে মানস চক্ষে দেখতে থাকে। আর চল্লিশ/পঞ্চাশজন বাচ্চাকে তার দেবশিশু বলে মনে হয়। মক্তব ছুটি হওয়ার পর ছেলেমেয়েরা ছুটতে থাকে। উল্লাস করে আকাশে বাতাসে তাদের আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। সকালের বাতাসে রোদের ভেতরে যে দৃশ্যের অবতারণা হয় তার খেলা তার মস্তিষ্কে চলতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। মন কিছুতেই সেখান থেকে সরতে চায় না। মানুষ বিশ্বাস আর মানসিক শক্তির জোরে কতদূর যেতে পারে সেটাই সে অনুভব করে। সে আর কি কি করতে পারে এখন সেটাই দেখার বাকি!
পাকা ধান নুয়ে পড়েছে খেতে। চাষির মাথায় নতুন ধানের সোনালি রং উথাল-পাথাল করে। অগ্রহায়ণের মাঠে এখন নিঃসঙ্গ শূন্যতা। সাদাটে নাড়াগুলো কেমন মুখ ব্যদান করে তাকিয়ে আছে। প্রায়ই ঘরের উঠানে ধানের সোনালি রং বিছিয়ে আছে। মুজামের উঠানেও আজ ধান ছড়িয়েছে। এই মুহূর্তে দুটো পা দেখতে পাচ্ছে সে। একটা পরিচিত কাপড়ের নিচে পা দুটো গুটি গুটি করে ধানের ভেতর বিলি কাটছে। সারা উঠানময় সে পা হাঁটছে। ধান ছড়াচ্ছে। রাফেজা মাথায় কাপড় টেনে নথ দুলিয়ে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছে। সেদিনের পর থেকে রাফেজার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তনই চেয়েছিল মুজাম। ছোট বউয়ের নগ্ন হাতে রোদের ঝিলিক দেখতে দেখতে সে কি জানি কি কল্পনা করে। তারপর থেকে রাফেজার সঙ্গে তার কথাই হয়নি। না ভুল হয়েছে খাতির জমাতে হবে। দেখে মনে হয় যেন আছর কেটে গেছে। আজকে বলবে সে কথাটা রাফেজাকে, এমন ধীর, স্থির-ই চেয়েছিল সে। এতো হাসাহাসি, বাড়ির বাইরে যাওয়া, পর পুরুষের কথা শোনার প্রতি আগ্রহÑএসব কাজ সে বরদাস্ত করে না। তার মনের মতো হলে আর কোনো কথাই নেই। আর যদি তার কথা মন দিয়ে না শোনে তাহলে সে কঠোর থেকে কঠোর হবে। নিরীহ মানুষের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা শক্তিশালীর মনের স্বাভাবিক ক্রিয়া। জগতে তাবৎ শক্তিশালীরাই তাই করেন। শুধু তাই নয়, নিজের পুরুষসত্ত্বার অলৌকিক উত্থান দেখে সে বিহ্বলতাড়িত হয়। নিজের ওপর তার আস্থা বাড়তে থাকে। এ আস্থা তাকে যে কোনো পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করতে সহযোগিতা করে। নিজের ওপর অদ্ভুত একটা বিশ্বাস দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়।
পলকা হাওয়ার মতো সে কথা তার মাথার ভেতর উড়ে উড়ে বেড়ায়। আর কিছুক্ষণ পর পর পানিতে বুড়বুড়ি ওঠার মতো অবিরাম বুড়বুড়ি ওঠে। আজ কি পৃথিবীর পথে প্রান্তরে নতুন কোনো কিছু ঘটতে চলেছে? বাড়ির পাশের ডোবার কচুরিপানাকে মনে হচ্ছে সুন্দর। এ সুন্দর সৃষ্টির জন্য সে পরম করুণাময়কে ধন্যবাদ দেয়। নিজের প্রতিপত্তি প্রভাব আরো বৃদ্ধি করতে মনে মনে সে পানা চায়। এই মুখডোবা গ্রামে তার শিকড় কত গভীরে পৌঁছেছে তা ভেবে সে পুলকিত হয়। অজানা অচেনা দুলালের বিধবা বোনটির চেহারা মনে পড়লে সে পুলকিত হয়। এই ধরনের নানা ঘটনা-উপঘটনা তার মনে বাউকুড়ানির মতো উড়ে উড়ে আমুল নাড়া দিয়ে যায়। আতকা আজ এমন খুশির বান ডাকছে দেখে বার বার সে ফরিয়াদ করে আরো বেশি বেশি পানা চায়। বিগলিত ভাবের সাগরে নিমজ্জিত হতে হতে শক্তি কামনা করে পরম করুণাময়ের নিকট।
সে এখন রাফেজাকে অনেক পছন্দ করে। যদিও কিছু দিন আগে একটা ধাক্কা লেগেছে মনে। তারপরেও যখন আজ সকালে আম্বিয়া তাকে আশ্বস্থ করেছে তখন ওাফেজার ওপর থেকে সব রাগ ধুয়ে মুছে গেছে। আম্বিয়া যা দিতে পারেনি তাই দিতে চলেছে ওাফেজা। ওাফেজার এখন একটু আদর যত্ন দরকার। আম্বিয়াকে সে বলেছে, বিশেষ নজর রাখতে। একটা খুশির খবর আসতে না আসতেই আরেকটা খুশির খবর তাকে বেদিশা করে তুলেছে। মালেক মেম্বারের ঘর আলোকিত করে সন্তান আসছে। কেউ না জানলেও সে জানে এই সন্তানের কেরামতি। অন্ধসুখের সেই ক্ষণটুকু কিছুতেই সে বিস্মৃত হতে পারে না। একতাল ফর্সা মাংসের রমণী চেহারা মুহূর্তেই তার চেতনাকে ডুবিয়ে নিতে চায়। কার্যকারণ সূত্রগুলো ভাবতে ভাবতে মালেক মেম্বারের চেহারাখানা তার চোখে ভেসে ওঠে।
মালেক মেম্বারের খুশি কে দেখে! এখনি তার মাজারের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। সন্তান ভূমিষ্ট হলে বলেছে মাজারে এনে নাম রাখবে। সেদিন গরু জবাই করে বড় করে মেজবান দেবে। তার ভিতরে ফূর্তি ধরছে না। মালেক মেম্বারের ভেতর আরো বিশ্বাস ভর করেছে। তার বুজুরকি সম্পর্কে আরো বিশ্বাস প্রোথিত হয়েছে।
ছয়
মুখডোবা বাজার। বাজারের পাশেই খাল। খালেও মানুষের যাতায়াত হয়। বাজারের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে মূল সড়ক। এঁকেবেঁকে গছে তা সদরগঞ্জের দিকে। সদর গঞ্জে হাট-বাজার মুখডোবার চাইতেও বেশি। সদরগঞ্জে পুলিশ আছে। মাঝে মধ্যে সদর গঞ্জের টহল পুলিশ রাতের বেলা মুখডোবাতেও আসে। মুখডোবা থেকে সদরগঞ্জের দূরত্ব সাত/আট কিলোমিটার। মোবাইল নেটওয়ার্ক সদরগঞ্জেই আছে। তাই বলে মুখডোবার মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে না Ñ তাই কি হয়! মুখডোবার মানুষও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ভাগ্য ভালো হলে কথা স্পষ্ট হয়, না হলে প্রায়শ হ্যালো বলতে বলতে দু একজনের হেলে পরে যাওয়ার দশা হয়। শুধুই কি তাই? বয়স যাদের কম তারা অসাধ্য সাধন করতে চায়। কখনও আম গাছে, জাম গাছে চড়ে যন্ত্রের কথা আরো স্পষ্টভাবে শুনতে চায়।
মুজামের একটা মোবাইল ফোন হয়েছে। যখন মোবাইলে কল আসে, তখন আল্লাহু আল্লাহু বলে সুরেলা আওয়াজ দেয়। মুজাম তখন ওটাকে পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে। চোখের সামনে একটু ধরে। দুচোখের পাতা ছোট করে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে। মনে মনে সে বোঝার চেষ্টা করে কে তাকে কল দিয়েছে। তারপর মোবাইলের কালো বোতামে চাপ দিয়ে কানে লাগায়। লম্বা একটা সালাম দিয়ে অপেক্ষা করে অপরপক্ষের কথা শোনার। খুব ঠান্ডা স্বরে কথা-বার্তা বলে। কুশল-বার্তা জিজ্ঞেস করে। চেনা-অচেনা মানুষের মধ্যেও তার রুহানির আলো ছড়িয়ে দিতে পারে। এই যন্ত্রটার মধ্যে দিয়ে যে সে তার খেদমতের রাস্তা প্রসারিত করতে পারে তাই তার এই যন্ত্রটার প্রতি একধরনের প্রীতিভাব রয়েছে। এই মোবাইলের কারণে মুজামের অনেক সুবিধা হয়েছে। অনেক দূর-দূরান্তের তাজা খবর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। উপদেশ নির্দেশ খয়রাত করারও দারুণ সুযোগ ঘটেছে। একসময় ছিল এমন পরিবেশের কথা মুজাম কল্পনায়ও আনেনি। আজ তার দিন বদলেছে। মাটির ওপর তার শক্ত অবস্থান হয়েছে। এখন আর সে ঝড়ে পড়া বৃক্ষের মতো অতো আলগা শিকড়ের বৃক্ষ নয়। এখন তার মূল অনেক দূর পর্যন্ত প্রোথিত।
মুজাম আগের মতো নেই। বাঁচার জন্য নিজের প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য তাকে অনেক ফন্দি ফিকির করতে হয়। মানুষকে আকৃষ্ট করে ধরে রাখা কম কঠিন নয়। তাই শুধু মাজারকে কেন্দ্র করে জিকির আসগর করলেই তার প্রতিপত্তি বেড়ে যাবে না। এর জন্য দরকার কিছু অন্ধ অনুসারী। যারা নিজের গরজেই তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে থাকবে। তাই মুজাম ভাবে সে একটা দল করবে। সে দলের কাজ হবে শাস্তি দেওয়া গোপনে গোপনে ওরা শক্তি প্রয়োগ করবে। এই যে এখন তার মনে হচ্ছে বাদশা ফকিরকে আর বাঁচতে দেওয়া যায় না। তাইলে ওর ব্যবস্থা করন লাগে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব। এখন যদি একটা বাহিনি থাকত, তবে বেগ পেতে হতো না। এ কাজের জন্য বিশ্বাসী লোক প্রয়োজন। যারা গায়ে শক্তি ধরবে আর ভেতরে আল্লাহ খোদার ভয় থাকবে। আগে ওদের ভাবনার জগতটাকে উল্টেপাল্টে দিতে হবে। বাদশাহ ভেবেছে সে পাগল সেজে সবার দৃষ্টি উন্মোচন করবে কিন্তু তা হতে দেবে না মুজাম। খোদকারি করো বেটা। নাফরমান, বেআক্কেল। ক্ষুব্ধ মুজাম বকাবকি করে কিন্তু মস্তিষ্ক ঠান্ডা হয় না।
সাত
‘ফকিরি কি গাছের গোটা
আরে ঢেঁকি যদি স্বর্গে যাইতো
ভবের বারা বাইনতো কেটা?
ফকিরি কি গাছের গোটা?’
বাদশা ফকির প্রায় এ গানটা গেয়ে রাস্তা পার হয়। থুতনির উপর একগোছা দাড়ি তার শনের মতো উড়ে। বাদশা ফকিরের কোনো বাড়ি নেই। এর ওর ঘর দুয়ারে পড়ে থাকে। কখনও গোয়াল ঘরে কখনও বা মসজিদের বারান্দায়। আবার কখনও বা রাস্তায়ই কেটে যায় ওর রাত। তার মুখে এ কয়েকলাইনের কথা ছাড়া আর কোনো কথা নেই। কোত্থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, কোনো চিন্তা নেই। মুখে শুধু একই কথাÑ ফকিরি কি গাছের গোটা?
একবার মুজামের মাজারের দিকে গিয়েছিল বাদশা। তখন বাদশাকে দেখে মুজাম থির নয়নে তাকিয়ে ছিল। অনেকেই বলেছে মুজাম বাদশাকে দেখে এমন চিন্তিত হলো কেন? তবে মুজামের সাগরেদরা বাদশাকে মাজারের ত্রিসিমানায় ঘেঁষতে দিতে নারাজ। কোন সময়ে পাগলে কি করে কে জানে? হেগে মুতে রাখলে সমস্যা। এই ভয়ে মুজামের কয়েকজন সাগরেদ বাদশকে ভিড়তে দিল না। বাদশাও বেশ উঁকিঝুকি মারছিল মাজার প্রাঙ্গনে এসে। তবে মুজামের বড় চালার দিকে এগুলে আর কেউ বাদশাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি। পাগলটা খালি গায়ে আম্বিয়ার সাথে কি কথা বলছিল যেন!
আম্বিয়া দেখল বাদশার গায়ে অনেক দিনের নোংরা জামা। গোসল করে না। কে জানে? ‘অই মিয়া গোসল করো না। কয়দিন?’
‘ফকিরি কি গাছের গোটা
‘ওরে ঢেঁকি যদি স্বর্গে যাইতো ভবের বারা বাইনতো কেটা?’
‘ফকিরি কি গাছের গোটা ॥’
‘না, বেডা তো জ্বালাইয়া মারল। এক কথা কয়বার কয় মানুষে। জিগাই তোমারে, গা গোসল ধোও নাা ক্যান?’
‘কে ধোয়ায় মা কার গা, আমি করি না কোনো রা। শেষবার মতো ধুইয়া দিও আমার গাওখানিরে।
‘হায়, হায় পাগলে কয় কি!’
‘মাগো এই দুনিয়া পাগলের কারখানা। ওই যে মাজার দেখ, ওই যে দেখ মাজারি, বেবাক পাগল, বদ্ধ পাগল। এই পাগল নিয়া করবা কি? চক্ষু মুইদা ঘুমাইছো গো মা, চক্ষু খুইলা দেখলা না। দেখলে দেখতা, নরক সনে বিরাজ করো নিজেই পাগল আর কেউ না।’
আম্বিয়া চিন্তায় পড়ে। কি বলে বাদশাহ পাগল। ওর কথার সুরের কি কোনো অর্থ আছে? কিন্তু আর বেশি ঘাটাতে তো সাহসও হয় না।
কে বলে কার কথা। বাদশাহ নাচে। আর একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে। বাদশাহর এই নাচন কুর্দন অনেকেই দেখে । হাসে। নিছক আনন্দ লাভ করে। বাদশাহ নাচ থামালে আবার জিজ্ঞেস করে আম্বিয়া, ‘গা গোসল ধোও না ক্যান?’
‘মাটির শরীল ধুইয়া কি অইব আম্মা, আসেন এই কলবেরে ধুইয়া সাফ করি। বহুত ময়লা জমছে এই কলবে আর তার মুর্শিদরে চেনে না। এই কলবটারে সবার আগে ধুইয়া পরিষ্কার করি।’
আট
এত বড় শয়তানি তার সাথে! এখনো খোদার ওপর তাওয়াক্কল আইলো না হারামজাদির! রাগে শরীরটা চোতরাপাতা ডলে দেওয়ার মতো জ্বলতে থাকে। ইচ্ছে করে এক্ষুনি গিয়ে চুলের মুঠি ধরে গরুপেটা করে। তাতে মনে হয় মনের ঝাল মিটতো। কিন্তু কাজটা করলে কথাটা বেশি জানাজানি হয়ে যাবে। ঘরের কথা বাইরে যাওয়ার পথ পেলে ইজ্জত নিয়ে টানাটানি পড়বে। তাই কথাটার মনে মনে মরণ কামনা করে মুজাম। খোদার ওপর অগাধ বিশ্বাস তার। এই কালনাগিনীর কথার ছোবল ভীষণ বিষাক্ত। তাই চুপ থাকার সিদ্ধান্তে কথাটা মাথার ভেতর উইয়ের ঢিবির মতো বাড়তে থাকে। কিন্তু এই অসহ্য রাত কিভাবে পার করবে? সে কথা ভেবে মুজাম অস্থির হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করছে এখনি গিয়ে গলায় ছেন বসিয়ে টান মেরে দেয়। রক্তের ধারায় হাত ধুয়ে মনের জ্বালা মিটায়। হাতের তসবি ঘোরে বটে মনের জিহ্বায় বুলি ফোটে না। খোদার দুইন্যায় বেরহম এই মুজামের হিংসার কালানল দাউ দাউ জ্বলতে থাকে। তারে নিভাতেই সে বাইর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। একটু মাজার ঘরে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আসবে। তাতে যদি মনের রাগ মেটে! যেতে যেতে তখন মেম্বারের সুন্দরী বউয়ের কথা ভাবে। মেম্বারের বউয়ের পেটে তার বাচ্চা Ñ এ কথা কিভাবে জানলো রাফেজা?
ইসশিরে ইচ্ছা করতাছে মুখের মইদ্যে পাড়া দিয়া জিগায়, ক এই কথা তুই কই পায়লি? মাথার ভেতর কথাটা ঘুরপাক খায়। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এসেছে মাজার সংলগ্ন মসজিদে। ওজুখানায় ঢুকতেই তলপেটে চাপ অনুভব করে। বদনা ভরে পানি নিয়ে চলে যায় প্রস্রাবখানায়। প্রস্রাব ফিরে এসে এবার ওজু করতে বসে। মাথার ভেতর কুট কুট করে কামড়ায় অবাধ্য ক্রোধ। তাকে ছেড়ে যাবে না মনে হয়। এত রাগ আসলে কেমনে? সে এবার ওজুর দোয়া পড়তে থাকে। পানি নিয়ে মুখে কুলি করে। নাকে পানি দেয়। দুই হাতের কনুই পর্যন্ত ধৌত করে মাথা মসেহ করে। আহ এবার বুঝি শান্তি লাগছে। কিন্তু মাথা মোসেহ করতে গিয়ে মনে হইল তালুটা গরম। সে চিন্তা পড়ে। আবার মাথায় হাত দেয়। সত্যই তো মাথার তালু গরম। আবার ঠান্ডা পানির ঝটকা হাতে নিয়ে মাথা মোছে। তালুটায় অনেকটা ভিজিয়ে দেয়। তার আগেই গোল টুপিটা লুঙ্গির কোরছায় শুয়ে আছে। এবার টুপিটা হাতে নিয়ে দুই হাতে ধরে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে মাথায় পরে নেয়।
চারপাশে তাকায়। কেউ নেই কোথাও। শুধু ফরিদের ঘর থেকে একটা কুপির আলো ঠিকরে বের হয়ে আসছে। সেদিকে তাকিয়ে মুজাম একটা শ্বাস ছাড়ল। তারপর হেঁটে মাজার সংলগ্ন মসজিদের ভেতর ঢুকে গেল। মসজিদ উপরে টিনের ছাউনি আর ইটের গাঁথুনি দেয়াল। তার উপরে কোনো পলেস্তারা পড়েনি। এখানে ওখানে ইটের টুকরো মুখ ভেংচে তাকিয়ে আছে। মাঝে মধ্যে মনে হয় ওই ইটগুলো মুজামকে মুখ ভেংচাচ্ছে। আবার দেওয়ালের একদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় একটা ছবির মতোন হয়ে গেল। সে ছবির ভেতরে কয়েকজন একটা লাশ নিয়ে দ্বিগবিদ্বিগ ছুটে যাচ্ছে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মনকে শক্ত করল মুজাম। রাফেজার এসব ভাওতাবাজি কথায় মন খারাপ করা তার শোভা পায় না। তার মন খারাপ করা মোটেও উচিত না। মাইয়া মানুষ লাগে কোনে কামে! একটু ভেচকি মারতে চেয়েও নিজের অবস্থান মসজিদে ভেবে সে ইচ্ছাকে দমন করে সে। মহান রাব্বুল আলামীন সব দেখছেন। তিনি রাফেজার নাফরমানির বিচার করবেন। সব শাস্তি মুজামকেই দিতে হবে কেন? কিন্তু মনে হয় রাফেজাহাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। না এত তাড়াতাড়ি তো তার হাতের মুঠ আলগা করলে চলে না। কিন্তু কিছু দিন আগেই তো বড় শাস্তি রাফেজা পেয়েছে। মাজার ঘরে তারে বাইন্দা সারারাত সেখানেই কাটাইছে রাফেজা। সকালে অচেতন অবস্থায় নিয়ে ফিরেছে ঘরে। তারে এই মুহূর্তে বড় কোনো শাস্তি দেবার কথা সে চিন্তা করতে পারছে না। তাহলে লাটাই তার হাতেই থাকেবে কিন্তু কাটা ঘুড়ি অন্য আকাশে উড়ে যাবে। তখন সবকিছু আগের মতো থাকবে না। তাই মাথা থেকে এখন রাফেজার চিন্তা বাদ দেওয়া দরকার বলে মনে করল। আরো কিছু সময় পর এসব ভাবতে ভাবতে মুজামের মনে হলো সে নামাজ পড়তে এসছিল। এখন তার নামাজ পরা দরকার। এতটা সময় এভাবে ভেবে ভেবে নষ্ট করার মানেই হয় না। তাই সে তাড়াতাড়ি নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে নিয়ত করে তাকবীর বলে হাত বাঁধল। লম্বা সময় নিয়ে নামাজ শেষ করে মুজাম মোনাজাত ধরল। আজ মোনাজাত করতে গিয়ে যেন কান্না পেল তার। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে নিজের জন্য বেশি বেশি দোয়া করল। নিজের রুহানি শক্তি বাড়ানোর ফরিয়াদ জানাল। কি দুরাবস্থ অবস্থা থেকে আজ সে মুখডোবা গ্রামের মুজাম আউলিয়া হয়ে উঠেছে, তা কাউকে বলা যায় না। নেিজই নিজের উন্নতি দেখেছে। এসবই মহান আল্লাহর কেরামতি। তার কোনো হাত নেই এখানে। সে শুধু নিজে একটু চেষ্টা করে গেছে মাত্র। তার মাথায় যে বুদ্ধি বিবেচনা আছে তা দিয়েই যদি তিনি দেশ ও দশের সেবা করাতে চান তাহলে ঠেকায় কে?
কিন্তু রাফেজার ব্যাপারে সে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। রাফেজার শাস্তি কি হওয়া উচিত সেটা সে ভাবতেই পারছে না। তবে এখনি আর কোনো সুযোগ রাফেজাকে সে দিতে চায় না। কারণ মেয়ে মানুষের বুদ্ধি কখন যে কি অঘটন ঘটিয়ে দেয় তা বলা যায় না। তাই এ নিয়ে আজকে আর বাড়াবাড়ি করা ঠিক হবে না ভাবে মুজাম। সংসারটাও একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এইখানে এমন বেদিশা হলে চলে না। সমঝে চলতে হবে। যত কষ্টই হোক রাগটাকে সে পোষ মানাবেই। মোনাজাত শেষ করে সে টের পায় হাতের স্পর্শে জলের ছোঁয়া। মনে মনে সে দিলের ওপর খুশ হয়। দিল তার এখনো মহান খোদাতালার প্রতি নরম আছে। এসব ভাবতে ভাবতেই মুজাম বের হয়ে আসে মসজিদ থেকে। তখন রাতের আকাশে তারা অগুণতি। সেদিকে তাকিয়ে মুজাম আরেকবার স্মরণ করে মহান শক্তি ধরকে। আর তখনই যেন একটা শব্দ সে শুনতে পায়। শব্দটা কোন দিক আসে ঠাহর করতে করতে তার সময় লাগে। মনে হয় একবার ফরিদের ঘর থেকে এমন শব্দ আসছে আবার মনে হয় তার ঘর ফেলে পাশের ডোবা থেকে যেন এ শব্দটি এসেছে। এমন একটা ধন্দে পড়ে মুজাম এদিক ওদিক তাকিয়ে ফরিদের ঘরের দিকেই পা বাড়াল। ফরিদের ঘরে তখনও মিটিমিটি আলো জ্বলছে। কাছে যেতেই একটা তরকারির ঘ্রাণ নাকে আছড়ে পড়ল। তখন টের পেল মুজাম খিদে পেয়েছে। কিন্তু একটা অভিমান ছোটবউ ওাফেজার মুখটা ভেসে উঠতেই মনটা বেঁকে বসল। কিছতেই বাড়ি অভিমুখে যেতে চাইল না। মনে কামনা করল ইশ এখন যদি ফরিদের সঙ্গেই চারটে মুখে দিয়ে যেতে পারতো! তাহলে আজ ঘরে ফিরে কোনো দানা পানিই মুখে তুলতো না। তাতে ছোট বউ রাফেজার দিল হয়তো এটু নরম হতো। আর বড় বউ আম্বিয়া যে কিনা মাটির মানুষ তারও দিলে ব্যথা বাজতো। যে তাদের খসম আজ রাতে কোনো দানা পানি মুখে তোলেনি। এমন একটা চিন্তায় ফেলার জন্য মনটা আকুল হয়ে উঠল মুজামের। তাই সে আস্তে আস্তে ফরিদের খিরকির বাইরে থেকে হাঁক ছাড়ল, ‘ফরিদ মিয়া কি রানতাছো? এমন খুশবো ছড়াইছে?’
ভেতরে ফরিদের তেমন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। তারপরেই ঘরের ঝাপটা সরে গিয়ে ফরিদের উদ্বিগ্ন মুখটা দেখা গেল। ‘আরে হুজুর সাব আহেন আহেন। কি কপাল আমার, আপনে এত রাইতে? কি মনে কইরা হুজুর? কোনো কিছু কি ঘটছে? কোনো দুঃসংবাদ কি পাইছেন?’
হুজুর দুঃসংবাদ আর কোনো নতুন বুদ্ধি ছাড়া যে এদিকে পা বাড়ান না তা ফরিদের জানা আছে। তাই সে ঝাপ সরিয়ে একেবারে উঠানে নেমে এল। ফরিদের ঘর দোচালা। একেবারে গরিবি হালত। এ জগতে এই পোড়া কপাইল্যার আর কেউ নেই। বিয়ে করেছিল বউটাও মারা গেছে। তারপর আর বিয়ে শাদি করেনি। মুখডোবা গ্রামে মুজাম আসার পর তার সাথে সাথেই আছে। অবশ্য সে সব কথা অনেক আগের তখন মুজামুল হক আজকের মুজাম হুজুর বা আউলিয়া হয়ে ওঠেনি।
‘না কোনো সংবাদ পাই নাই। এমনেই মনটা বেচিন হইছে তাই তোমারে দেখতে আইলাম। খাবার বন্দোব্যস্ত করতাছো না? কি তরকারি রানছো?’
‘না হুজুর তেমন কিছু না। এই একটু মুসুরের ডাইল আর আলু ভর্তা বানাইছি।’
বাহ ভালোই তো মনে হইতাছে।
হুজুর খাইবেন দুইডা? দেই।
ভেতরের কথাটা যেন ফরিদ টান মেরে বের করে আনলো। মুজামও দেরি করলো না। তাড়াতাড়ি বসে পড়ল। একজনের ভাত দুজনের মধ্যে ভাগ হলো কিংবা ফরিদের সকালবেলার খাবারটুকুই মুজাম খেয়ে নিল। ফরিদ পরম যত্নে নিমকটা পানিটা এগিয়ে দিল হুজুরকে। কিন্তু ফরিদের মাথায় ঢুকলো না কেন মুজাম হুজুর আজ তার বাসায় পাত পাতলেন!
নয়
পাত পেতেছেন ঠিক তাই বলে তো রাতযাপন করতে পারেন না! তাই মুজামকে খাওয়ার পর এটা সেটা বলে বের হতে হলো। তখন সব সুনসান। শুধু ভুতের মতো গাছগুলো জবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির উঠানে এসে মুজাম দেখলো এখনো তার বড় বিবির ঘরে আলো জ্বলছে। আর ছোটো বিবি রাফেজার ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। মুজাম উঠানে একটু দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ঘরের বড় বিবির ঘরের ভেতর ঢোকে। দরজার পাল্লা ভেজানোই ছিল। ঠেলা দিতেই খুলে গেল। দেখলো খাটের উপরে পা ঝুলিয়ে বসে আছে আম্বিয়া আর মেঝেতে খাবার-দাবার ঢাকা আছে। বসে বসে আম্বিয়া ঢুলু ঢুলু চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। মুজাম ঢুকতেই হতচকিত হয়ে আম্বিয়া উঠে দাঁড়াল। চেহারায় একটা সন্ত্রস্থ ভাব। চোখের লেই গভীরভাবে বসে আছে। সারাদিনের খাটুনি কম না। সন্ধ্যা হলেই ঘুম ঢুলুঢুলু চোখ আর মেলে রাখা যায় না। মুজামুল হক ঘরের মধ্যে খাটের ওপর গিয়ে বসে। আর নিচে আম্বিয়া ভাত বাড়তে থাকে। কিন্তু মুজাম শুয়ে পড়ে।
আম্বিয়া বলে, কি ব্যাপার শুইয়া পড়লেন যে, ভাত খাইবেন না? ভাত বাড়ছি আসেন ভাত খাইয়া লন।
‘ভাত খাওনের ইচ্ছা নাই। তোমার মন চাইলে তুমি খাও।’
আম্বিয়া ব্যথাভরা চোখ নিয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল। কি করবে বুঝতে পারল না। আম্বিয়া এবার থালাবাটি গোছাতে লাগল। সে না খেয়েই ভাত থালা আবার তুলে রাখতে লাগল। সে বুঝতে পারল আজ স্বামী আর ছোট বউয়ের ঘরে যাবে না। সে সব গুছিয়ে রেখে এবার হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে বিছানার একপাশে খালি জায়গায় শুয়ে পড়ল। খালি পেটে রাতে ভালো ঘুম হয় না। আম্বিয়া কেন খেল না নিজেই বুঝল না।
দশ
রাফেজাকে আলতাফ ভুলতে পারেনি। যতই ওর সঙ্গে খুনসুটি করুক না। যতই পায়ে পায়ে লেগে থাকুক রাফেজাকে আলতাফ কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। মুজাম ওর বাবাকে ভয় দেখিয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেলেছে। আলতাফ গ্রামে থাকলে এই কাজটা কিছুতেই হতে দিত না। এখন রাফেজার দুঃখের কথা শুনলে আলতাফের কিছু ভালো লাগে না। ভেবেছিল একবার মুখডোবা থেকে চলে যাবে আর ফিরবে না। কিন্তু মুখডোবা যেন তাকে তাবিজ করেছে। এর আকর্ষণ অন্যরকম। কিছুতেই এই টান ভোলা যায় না। এমনিতে জন্মভূমি তার ওপর এখানে রাফেজাথাকে। আলতাফের সব পথ মনে হয় রাফেজার দিকে গিয়েছে। ইশকুল ঘরটা উঠাতে পারলে ভালো হতো। এখানের ছেলেমেয়েরা দ্বীনই শিক্ষার পাশাপাশি ইশকুলেও পড়ত। নামধাম লিখতে পারতো। হয়তো কেউ ইশকুল ডিঙিয়ে আরো উপরে উঠতো।
তাকে পারতেই হবে। একটা ইশকুল সে দেবেই গ্রামের তরুণদের সে একসাথে করবে। সে ডিগ্রি পাস করে এভাবে বসে থাকলে চলবে না। গ্রামে চলতে হলে এখানেই তাকে ইনকামের রাস্তা বের করতে হবে। সে নিজেদের একটা ছোটখাট পুকুর আছে। ইতিমধ্যে ওটা সাফ করে মাছের উপযোগী করে ফেলেছে। শুনেছে কৃষিব্যাংক লোন দেবে। একটু লোন সে নিতেই পারে। কয়েকটা গরু আর হাঁস-মুরগী দিয়ে শুরু করবে। আর পশ্চিমের জমিটায় হবে তার স্বপ্নের ইশকুল। লম্বা একটা ঘর। তাতে খোপ খোপ করে ইশকুলের ক্লাস চলবে।
এগারো
দিলুয়ার মুজামের ভক্ত। মুখডোবার পাশে নয়নখোলা। দিলুয়ার নয়নখোলা গ্রামের একটা এবাদত খানা চালায়। গ্রামের মাতবরই জায়গা দিছে তাকে। ওখানেই উঠেছে। এক বাড়িতে জায়গির থাকে। এবাদত খানায় আযান দেয়। নামাজ পড়ে। লোকজনের কাজও করে। সকালে পোলাপান পড়ায়। বেশিরভাগ সময় মাতবরের পিছে পিছেই ঘোরে। তবে মাতবর খুব তাড়াতাড়ি পাত্তা দিচ্ছে না। মাতবর বলেছে, ধীরে সুস্থে। একলাফেই গাছের ডগায় উঠা ভালো না। মাঝে মধ্যে মুখ ডোবার মুজাম পিরের কাছে তালিম নিতে যায়। মুজামও ওয়াছ নসিহত করে। নানা কুটকৌশল শিখায়।
মুজামকে দিলুয়ার মান্যিগণ্যি করে। মুজামও বোঝে ভক্তের অভিসন্ধি। পাকা কলা যতই সে খাওয়াক মুজামের মনটা এত তাড়াতাড়ি গলে না। মুজাম ধীরে ধীরে আগায়।
‘হুজুর ক্যামনে কি করি? আপনার পরামর্শেই তো চলতাছি।’
‘চলো। চলতে চলতে একদিন সিদ্ধিলাভ করতেও পারো।’
‘হেই ভরসায় তো আছি হুজুর।’
‘বিয়া শাদি করছো?’
না হুজুর?
‘ক্যান নোয়াখালি বেগমগঞ্জে এতদিন কি এই তাগড়া শরীর লইয়া এমনেই আছিলা?’
দিলুয়ারের চেহারা আরো কালির মতো হয়ে যায়। তা দেখে মুজাম আড়চোখে তাকিয়ে মৃদৃ হাসি হাসি মুখ করে বলে, ‘এতবড় মিছা কথাখান তুমি কইতে পারলা দিলুয়ার?’
দিলুয়ার ফান্দে পরা ঘুঘুর মতো ছটফট ছটফট করতে থাকে। চোখ নামিয়ে শরমিন্দা হয়। পায়ের নখে মাটি কাটে।
‘কি দিলুয়ার মিয়া কিছু কও না যে?’
‘কি কমু হুজুর আপনার তো কিছুই অজানা নাই?’
‘তাইলে নোয়াখালিতে তোমার বিবি আছে! তাই না?’
‘হ, হুজুর, আছে।’
‘কিন্তু এই খানে একটা অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের মাইয়্যা তোমার বিয়া করন লাগবো।’
‘হুজুর আপনেই এই কামডা সাইরা দিয়েন।’
‘হ দিমুনে কিন্তু তার আগেই তুমি মাংসের স্বাদ পাওন বাঘ অঘটন না ঘটাইয়া দাও।’
দিলুয়ার মনে হয় হুজুরের কথাটা বিশেষ বুঝতে পারল না। তাই একটু বোকা বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
‘হুজুর কি কিছু কইলেন আমারে!’
‘তো আর কারে কইলাম মিয়া? তোমারেই কইলাম খবরদার কোনো আকাম কইরো না। শরীরতো একটা আখামা বানাইছো।’
দিলুয়ারের মুখ রাঙা হয়ে উঠলো। তবে কালো মুখের ভেতর আর কিছু না দুটো চোখের মণি লজ্জায় কিছুটা অবনত ভাব প্রদর্শন করে। মুজামের খাদেম ফরিদ ততক্ষণে একগ্লাস পানি আর দুটো নারু এনে রেখেছে দিলুয়ারের সামনে। দিলুয়ার একবার ত্যাড়াচোখে সেদিকে তাকিয়ে হুজুরের অনুমতির অপেক্ষায় থাকে। মুজাম বলে কি দিলুয়ার বহুদূর হাইট্যা আসছো কিছু তুলো মুখে।
দিলুয়ার একটা নারু মুখে দিয়ে চিবুতে থাকে। রস চিবিয়ে আস্বাদন করে ঢখঢখ করে গ্লাসের পানি গলায় ঢালে। তারপর বলে, ‘হুজুর আমি কি করবো এখন?’
মুজাম চুপ করে থাকে। দিলুয়ারের উপস্থিতি তার খুব একটা সহনীয় মনে হচ্ছে না। ওকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু এই সময়ে ওকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে না। একটু পরেই আসরের ওয়াক্ত হবে। ও এখানেই নামাজ পড়ে যাবে। কিন্তু দিলুয়ারকে একবার জিজ্ঞাসা করার দরকার ছিল সে যে চলে আসল তার নয়নখোলা গ্রামের এবাদত খানায় আজকে আসরের নামাজ কে পড়াবে? মনে হতেই মুজাম গলায় দুটো ছোট্ট কাশ দিয়ে কথা শুরু করলো।
‘দিলুয়ার এইবেলা তোমার এবাদত খানায় নামাজ কেডায় পড়াইব?’
‘হুজুর সে ব্যবস্থা আমি কইরা থুইয়া আইছি।’
‘কি ব্যবস্থা?’
দিলুয়ার হুজুরের দিকে তাকিয়ে একটু থতোমতো খেল। ধরা পড়া গলায় বলল, ‘আমার ছাত্র আলাল চান সেই এইবেলা নামাজ পড়াইব।’
‘তোমার আলাল চান নিয়ম-কানুন, সুরা-কালেমা জানে তো?’
‘শিখাইছি তারে।’
‘বাহ, তাইলে তো কাম একখান কইরাই ফেলাইছো।’
ফরিদ এসে জানাল। ওয়াক্ত হয়েছে আযান দিবে কিনা। মুজাম আযানের অনুমতি দিল। দিলুয়ার উঠে গিয়ে ওজু করে আসল। আযান পড়তে পড়তে আরো দু তিনজন এসে মসজিদে ঢুকল। সবার বয়স ষাটের উর্ধ্বে। কোনো তরুণ এখানে সামিল হয়নি। তবে কিছু কিছু ছোট ছোট বাচ্চা এসে সারি করে দাঁড়াল। ওরা এই মসজিদে সকালে মুজামের কাছে কায়দা পড়ে।
দিলুয়ার উসখুশ করছিল। তাড়াতাড়ি তাকে যেতে হবে। কিন্তু মুজাম অনেক লম্বা ছুরা পড়তে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে অনেক সময় লেগে গেল। নামাজ শেষে যখন দিলুয়ার বিদায় জানাতে গেল তখন মুজাম ওর পেরেশানি মুখ দেখে বলল, ‘নিরাশ হইয়ো না। চেষ্টা চালাও, চেষ্টায় কিনা হয়। ধৈর্য ধরো সব ঠিক অইয়া যাইব। একদিন তোমারও সব হইব। কিন্তু সবার আগে নিজের শিকড়ডারে একটু শক্ত মাটিতে রোপণ করো। কথাডা বুঝলা কিনা!’
মুজাম মাথা নাড়ে। এখন আর কথা শুনতে ভালো লাগছে না। কিভাবে এখান থেকে বের হয়ে সে তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করবে সে চিন্তায় আছে। না হয় মাগরেবের আগে নয়নখোলায় পৌছানো সম্ভব না। তাই হুজুরকে একটা সালাম দিয়েই লম্বা লম্বা পা ফেলে দিলুয়ার নয়নখোলার দিকে হাঁটতে শুরু করে। বেলা ডোবার আগেই সে নয়নখোলায় পৌছতে চায়।
বারো
কুসুমের বয়স সাত কি আট। বেশ ফুরফুরে মেয়েটি। ওর মারও তেমন বয়স হয়নি। মনেই হয় না কুসুমের মতো একটা মেয়ে আছে মহিলার। শরীরে গাঁথুনি বেশ শক্ত। কুসুমের বাবা জন খাটে। নিজের জমি কিছুই নেই তার। লোকজনের কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে চলে। ভাগা গরু পালে। পাটের সময় পাটক্ষেতে ধানের সময় ধানক্ষেতে কাজ করে। তবে বেশির ভাগ সময় তাকে মাতবরের জন খাটতেই দেখা যায়। নয়নখোলা গ্রামে কুসুমের বাপ বললেই সবাই চিনে।
তার আসল নাম মকসুদ। সে নামখানা প্রায় হারাতেই বসেছে। যেখানেই যায় সেখানেই তাকে কুসুমের বাপ কয়েই ডাকে। তবে এ ডাক মকসুদের খারাপ লাগে না। দিলুয়ার মুনশী প্রায়ই এখন নামাজকালামের কথা বলে। বলে বাড়ির কাছেই এবাদতখানা মাঝে মধ্যে দু এক ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পড়তেই তো চলে আসবে। তাই এখন মাগরেব আর এশার নামাজ মক্তবে পড়ে। সেখানে দিলুয়ার তার বেসুরো গলায় খোদার রহমতের নানা কথা বর্ণনা করে। একটা ঘোরের মধ্যে যায় অবশ্য তবে বেশিক্ষণ তার রেশ থাকে না। মকসুদকে এখনি সবাই খায় খাতির করতে শুরু করেছে। মেয়েটা বিয়ে দেবে কিনা এখনি কানাঘুষা শুরু হয়েছে। কিন্তু মেয়ের মা কিছুতেই মেয়েকে বিয়েশাদি দেবার কথা স্বীকার করে না। সে বলে, আমাগো একটা মাইয়্যা সাধ্য মতো পড়ামু। আদব-কায়দা শিক্ষা দিমু। কতো আনন্দ কতো কিছু এত তাড়াতাড়ি ক্যান সংসারে ভির ঠেইল্যা দিমু! কুসুমের মা কইতরি সংসারের হাল ধরেছে নিজেই। সেও কাজ করে সমান তালে। মাতবরের বাড়িতে কাজ করে। ধান-পাট-ঘর- গেরস্থালি সব কাজই করতে পারে। কাজেই সংসার কইতরির সিদ্ধান্তেই চলে। সেখানে মকসুদ রসদ জোগায় কেবল!
সকাল হলেই উঠান ঝার দিয়ে স্বামী আর মেয়ের খাওয়া তৈরি করে। দুপুরের রান্নাটা সেরে ঢেকে রেখে যায়। মেয়েকে বলে যায় স্বামীকেও বলে যায়। মেয়ে স্কুলে যায় ময়নার সঙ্গে। ময়নাদের বাড়ি পাশেই। কুসুম বলতে গেলে সারা দিনই ময়নার সাথেই খেলে। ময়নার বাপ অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ। নিজের জায়গা জমি ভালোই আছে। বাড়ির চারপাশে আম কাঠালের ছড়াছড়ি। তাই ময়নার সঙ্গে মেয়ে ঘোরে এতে কইতরি আর মকসুদ মনে মনে খুশিই হয়। নিশ্চিন্ত থাকে এই ভেবে ময়নার মা কুসুমকে আদরও করে। ময়নার সঙ্গে সঙ্গে কুসুমকেও খেতে দেয়।
তেরো
কুসুম আর ময়না একটা প্রজাপতির পেছনে পেছনে ছুটছিল। কিন্তু হঠাৎ প্রজাপতিটা অনেক উপরে উঠে গেল। তখন ওরা একটা ফড়িং ধরবে বলে চেষ্টা করছিল। আশ্বিনের রোদ বেশ তেজি। ওদের কপাল চুঁইয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে নামছে। কিন্তু ওদের তাতে খেয়াল নেই। ফড়িংটা কুসুমের হাতে ধরা পড়ল। ফড়ফড় করে ওড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে ফড়িংটা নিশ্চুপ হয়ে গেল। ময়নার খুশির শেষ নেই। সে বারবার হাতে তালি দিয়ে উঠছিল।
কুসুম বলল, ‘কিরে এমুন কইরা লাফাস ক্যা?’
‘খুশি লাগতাছে। আমারে একটা ধইরা দিবি!’
‘ফড়িং ধরা বহুত কষ্ট!’
‘হ, আমারে ধইরা দিবি না হেইডাই ক।’
‘রাগ করছ ক্যা ধইরা দিমু তো।’
‘ত্ইালে ধর।’
‘হ ধরতাছি।’
ঠিক সে সময় দূরের পথে একটা গানের সুর ভেসে আসে। যেখানে ধানের ক্ষেতে পাগল হাওয়া বয়ে যায় সেই পথ ধরে বয়াতি চাচা গান গেয়ে গাঁয়ের পথেই আসে। সুরটা খুব মনকাড়া। বাচ্চা মেয়ে দুটো সব ভুলে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। বয়াতি চাচার গানের সুর হাওয়ায় উড়ে কানে বাজে।
‘তুমি ঘরের কাছে ঘর বানাইয়া আছো লুকাইয়া
ডাকলে তুমি দাও না সাড়া খুঁজি মরিয়া
তুমি ঘরের কাছে ঘর বানাইয়া আছো লুকাইয়া।
ওরে বেভুল আর কতকাল ঘুরবি পথে পথে
পথের খবর নিলি শুধু রইলি আপন মতে
আপন খবর হইলো না তোর
পরের কাছেই রইলি বিভোর
দিন ফুরালে সন্ধ্যা হলে মরবি কান্দিয়া।’
বয়াতি চাচা এসে ওদের সামনে দাঁড়ায়। মেয়ে দুটোকে অদ্ভুদভাবে তাকিয়ে দেখে। কুসুম আর ময়নাও তাকিয়ে থাকে বয়াতির দিকে।
‘কি গো মা জননীরা, কেমুন আছো?’
‘ভালো আছি চাচা। আপনে কেমুন আছেন?
‘এই তো মা আল্লাহপাকে রাখছে। তোমাগো আম্মা আব্বারা কি ভালো আছে?’
‘হ চাচা, ভালো আছে।’
‘দেহি সময় পাইলে যামুনে একপাক।’
‘হ আইসেন চাচা আমগো বাড়িত।’
‘হ গো মা, আইমু। আইমু।’
ময়না বলল, ‘আমাগো বাড়িতে যাইয়েন চাচা। নতুন গান শুনমু।’
‘হ গো মা, নতুন গান শুনাইমু।’
চলে গেল বয়াতি চাচা। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় ইয়ত্তা নেই তার। মাস ছমাস আগে বড় মেয়েটি মারা গেছে। আরেকটি মেয়ে আছে। বয়াতি চাচী মেয়েটিকে নিয়ে কাজ করে সংসার চালায়। চাচা এমন করে দেশ-বিদেশ ঘুরে চার পাঁচ মাস পর উদয় হয়। কিছুদিন থাকে আবার চলে যায়। এভাবেই মনসুর বয়াতির সংসার চলে।
ময়না আর কুসুম এবার গাছের নিচে রাখা মালাইপাতি নিয়ে বসে। সেখানে কত রকমের পাতা ছিড়ে শাক করা হয়েছে। বালু দিয়ে ভাত রান্নার প্রস্তুতি চলছে। আরো নানারকমের আনাজপাতি রয়েছে। একজন পুরুষ হয় অন্যজন স্ত্রীলোক। এভাবে ওদের খেলাঘর চলতে থাকে। সংসারে কত ঝামেলা নিয়ে ওরা আলোচনা করে। আবার কত ঝামেলা যে ওরা সমাধান করে। ঠিক বড়দের বিষয় আশয় গুলো ওদের কাছে ধরা দেয়। কেউ একজন ওদের এই নির্জন খেলাঘর প্রত্যক্ষ করে, তা ওদের চোখে পরে না। লোকটি লোভাতুর হয়ে দেখে। মুখটা ঘামে চকচক করে। ধূর্ত শেয়াল যখন মুরগি ধরার আগে গোঁফে তা দেয় ঠিক তেমন করে লোকটি মেয়ে দুটিকে দেখতে থাকে।
কুসুম কি কারণে যেন হঠাৎ একটু আনমনা হয়। আর তখনই একটা সাদা পোশাক তার চোখে ঝিলিক মারে। ভালো করে ঠাহর করে বুঝতে লোকটি কে?
ফিসফিস করে ডাকে, ময়না এই ময়না।
কি অইছে? ডাকছ ক্যা?
পিছনে চাইয়া দেখ মুনশি আমাগো দেখতাছে।
কোন মুনশি দেখতাছে?
কোন মুনশি আবার নতুন মুনশি।
গ্রামে দিলুয়ারকে সবাই নতুন মুনশি ডাকে। বয়সে বেশ জোয়ান জান আর এ গ্রামেও এসেছে সে বেশিদিন হয়নি।
‘নতুন মুনশি আমগোরে দেখতাছে ক্যান?’
‘আমি কেমনে কমু!
ময়না উঠে দাঁড়ায়।
কুসুম জিজ্ঞেস করে, ‘কি করতাছস?’
‘জিগাই মুনশিরে ওইহানে লুহাইয়া কি করে?’
কুসুম হাসে। ‘হায় হায় কছ কি! এই কথা জিগাবি তুই মুনশিরে?’
‘ক্যান জিগাইলে কি অইছে?’
‘না কিছু অইব না।’
‘তাইলে আর জিগাইতে দোষ কোথায়!’
‘হ জিগা। ওইহানে মুনশি দাঁড়াইয়া কি করে!’
ময়না একটু উচ্চ গলায় ডাক দেয়।
‘এই যে নতুন মুনশি হুজুর, আপনে ওইহানে কি করেন?’
মুনশি দিলুয়ার একটু হকচকিয়ে যায়। সে ভেবেছিল মেয়ে দুটো তাকে দেখতে পাবে না। কারণ সে নিজেকে একটা ঝোপের আড়ালেই লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এভাবে ধরা পরা যাবে সে ভাবেনি!
‘না না, কিছু না। তোমরা কি করতাছো?’
‘আমরা তো খেলি হুজুর।’
‘ভালা। খেল খেল। তয় আইজকা তোমাগো ইস্কুল নাই?’
‘না আইজ তো ইস্কুল বন্ধ।’
কথা বলতে বলতে দিলুয়ার এগিয়ে আসে।
‘তোমরা ইশকুলে পড়ো?’
‘হ পড়ি তো!’
‘না কইতে ছিলাম কি তোমরা তো মক্তবেই ভালা পড়তাছ। আবার ইশকুলে যাওনের কাম কি!’
‘এই ডা কি কন নতুন মুনশী?’
‘হ হাচাই কই।’
‘ইশকুলে যাওন গুনাহ বহুত গুনাহ। আল্লাহর কালাম পড়ো। ওইসব ইশকুল ফিশকুলে গিয়া আল্লাহর নাফরমান হইও না।’
মেয়ে দুটি চুপ করে থাকে। নতুন মুনশির কথায় তারা আর কোনো কথা বলে না।
দিলুয়ার নিজেকে সামলাতে পারে না। গ্রামের তেমন কাউকেই সে পাচ্ছে না। একাকি আর ভালো লাগছে না। আগের গ্রামে তার বউ ছিল। এখানে কেউ নেই। তাই ভেতরে একটা অবোধ পশু ছটফটায়। সে দহনজ্বালা কাউকেই বলতে পারে না দিলুয়ার। কিন্তু এর একটা বিধি ব্যবস্থা করতেই হবে তাকে। মক্তব থেকে আসা মেয়েগুলোর দিকে প্রায়ই সে তাকিয়ে থাকে। ভাবে এদের মধ্যে কাউকে পাকড়াও করলে কেমন হয়। বিশেষ করে তার কুসুম আর ময়নার দিকে চোখ যায়। এই মেয়ে দুটো তাকে খুব টানে। বয়স কম হলেও তার ভেতরটা পশুর মতো জেগে ওঠে। আর মনে হয় মেয়ে দুটোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজের প্রয়োজনটুকুও মিটিয়ে নেওয়া যাবে। সে তক্কে তক্কে থাকে কখন এই মেয়ে দুটোকে আবার নির্জনে পাবে। তবে এদের কাবু করতে হলে একটা আজগুবি গল্প ফাদতে হবে। গল্পটা কি? একটা জ্বীনের গল্প বানাতে হবে। যা শুনে ওরা প্রলুব্ধ হয়। আর যাতে ঘুণাক্ষরেও এই কথা কাউর কাছে ফাঁস না করে। সে ব্যবস্থাও করতে হবে। সকালে ছুটি হলে ওদের জ্বীনের গল্প বলতে হবে। দিলুয়ার মনে মনে বেশ উল্লসিত হয়।
চৌদ্দ
সন্ধ্যার রেশ চারদিকে ভালোভাবেই ছড়িয়েছে। সে মাজার সংলগ্ন মসজিদ থেকে মাগরিবের নামাজ পড়ে বের হলো। দেখল পুবের আকাশ আস্তে আস্তে ঢেকে যাচ্ছে সন্ধ্যার আবিরে। চোখে কি যেন দুটো ছায়া আটকে গেল। ভালো করে ঠাহর করে তাকাল। চিনতে পারছে মনে হয়। আবারও ভালো করে দৃষ্টি স্থির করল। তখন রাফেজার অবয়বটা পরিষ্কার হলো। রাগটা চিড়বিড় করে উঠে এল মাথায়। কিন্তু করার কিছুই নেই। মুসল্লিরা কেবল নামাজ পড়ে বের হয়েছে। এখনো ময়দান ছেড়ে যায়নি। সে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল আলতাফ আর রাফেজার দিকে। সে দেখল আলতাফের সাথে রাফেজা বাড়িতে ঢুকছে। এই ছেলেটার সঙ্গে ওাফেজার মেলামেশাটা একটু বেশি বেশি মনে হয় মুজামের। ঘরের বউ পরপুরুষের সঙ্গে খায়খাতির রাখলে তো ভালো দেহায় রীতিমতো পিত্তি জ্্বলে মুজামের। ইচ্ছে করে এখনই দৌড়ে গিয়ে বউয়ের পিঠে চেলাকাঠ ভাঙে। কিন্তু একবার শিক্ষা হয় নাই তারে কি এতবার কইরা শিক্ষা দেওন যায়! বেশি বেশি দিলে তার তো সাহস বাইরা যাইব। তখন কোনো কিচুতেই আর ভয় পাইব না। এইসব বেহায়া বেলাজ মেয়েছেলেকে কি যে কঠিন শাস্তি দেয় মনে মনে তার হিসেব কষে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল মুজাম।
মুসল্লিদের চলে যাওয়া পর্যন্ত কোনো রকমে রাগটা চেপে রাখল। তারপর ধীর স্থির পায়ে এসে ঢুকল বাড়ির ভেতর। উঠানের চুলায় আগুন জ্বলছে। তার আলোয় দেখতে পেল আম্বিয়াকে। তার পাশেই বসে আছে রাফেজা। চোখ মুখ গাভীন গরুর মতো মায়াময়। তার উপরে চুলার আলোয় কেমন যেন স্বর্গীয় মনে হচ্ছে। ইশ তার বউ হয়ে তার শত্রুর সঙ্গে চলাফেরা! কিছুতেই মানতে পারছে না মুজাম। ইচ্ছে হচ্ছে চুলার ভেতর থেকে জ্বলন্ত কাঠের চেলি নিয়ে হাপ্পুরহুপ্পুর করে পিটায়। পিটাতো যদি না সে পোয়াতি হতো। হাজার হোক তার সংসার জুড়ে খাঁ খাঁ একটা শুন্যতা বিরাজ করছে। সেই শূন্যতা পূরণ করতে চলেছে রাফেজা। এখন বেআক্কেলের মতো কাজ করা ঠিক হবে না। কিন্তু কিছু কথা না শোনালে স্পর্ধা বেড়ে যাবে। এই আস্পর্ধা ভয়ংকর। দিন গুখক্কুর সাপের মতো বেড়েই চলেছে। যা হোক মুজাম ঠান্ডা গলায়, জিজ্ঞেস করল, ‘বিবি এইটা তুমি কি করলা?’
রাফেজা চুলার পার থেকে চোখ বড় বড় করে তাকাল। আম্বিয়াও জড়সড়ো হয়ে মুজামের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। দুজনেই চুপ মেরে থাকে। মুজামের পরবর্তী বাক্য শোনার অপেক্ষায় দুজনের শ্রবণইন্দ্রিয় বিপদ আশংকায় হরিণীর মতো টান টান উত্তেজনায় মুুহূর্ত গুণতে থাকে।
‘আলতাফের সাথে তোমার কিসের খায় খাতির? ও আমার শত্রু। আমার মাজার নিয়া যা-তা কথা কয়। অর লগে কিসের খায়-খাতির হুনবার পারি?’
‘আপনার শত্রু কি মিত্র তা জানি না। আলতাফ গ্রামের মানুষের উপকার করতে চায়। হে ভালা মানুষ।’
‘তয় আমি কি করি?’ একটা হুংকার ছারে মুজাম। এই হুংকারে কেঁপে ওঠে আম্বিয়া ও রাফেজা। বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে আছে যেন! কিন্তু মুহূর্তমাত্র। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় রাফেজা। মাথার কাপড় ফেলে দিয়ে ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে মুজামের দিকে। মুজাম ভেবেছিল এই রাফেজার পরিবর্তন হয়েছে। এখন তার ভুল ভাঙল। উড়ো হাওয়ায় মেয়েটা বিগড়ে গেছে। আছর এখনো কাটেনি। ভেবেছিল সে রাতেই আছর কাটবে। কাটেনি, হায় আফসোস!
‘নেহাত তুমি পোহাতি হইছো, আমার সন্তান তোমার গর্ভে, না হয় তোমার পিঠের তক্তা আমি আগুনের চেলা কাঠে ভাঙতাম। আমার বংশধর আসুক। লাত্থি মাইরা ঘরের থন বাইর কইরা দিমু। তহন হিয়াল-হগুনে খাবলাইয়া খাইব।’
ঠোকর খাওয়া ক্রুব্ধ বাজপাখির মতো তাকাল রাফেজা। রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে দিল মুখে। মুজাম বলল, ‘শয়তানি হাসি হাসস ক্যান?’
রাফেজা বলল, ‘পত্যিশোধ নিমু আমি, পত্যিশোধ।’
মুজাম ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে থাকে। কিসের পত্যিশোধ নিতে চায় রাফেজা!
বড় ঘরের দিকে যেতে যেতে আলো আঁধারিতে উচ্চারণ করে রাফেজা, ‘বংশধর, কার বংশধর? আপনের? আপনের বংশধর তো এইখানে না, সে তো আইতাছে মেম্বরের ঘরে।’
ঠাডা পড়েছে যেন মুজামের মাথায়। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। সে এইমাত্র যেন তার উপরে বজ্রপাত হয়েছে। ঠাডা পড়া মানুষ কেমন হয় দেখতে, সে জানে না। মনে হচ্ছে ওরকম কিছু একটা হয়ে গেছে সে। পরমুহূর্তেই সে রাগে থর থর করে কেঁপে উঠে। কি বলবে ভেবে পায় না।
চুলার পাশ থেকে খামোশ হয়ে বসে থাকা আম্বিয়া তার দিকে তাকিয়ে আছে। দু’চোখে তার অবিশ্বাস। চোখ জোড়া ঠেলে বেরিয়ে এসেছে অনেক দূর। চুলার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।
শুরু করলে আর নতুন করে কিছু ভাববার প্রয়োজন নেই। জেগে থাকো, হাঁটো কিংবা বিড়ি খাও…
Ismat Shilpi2025-03-30T20:27:10+00:00March 30, 2025|
কুন্টার মুক্তির আনন্দ
Sumon Biplob2025-03-30T10:38:17+00:00March 30, 2025|
গঙ্গা পাড়ের বৃত্তান্ত
Priyojit Ghosh2025-03-29T12:19:22+00:00March 29, 2025|
আমি ও জ্যোতি পোদ্দার
Jyuti Podder2025-03-30T09:42:15+00:00March 29, 2025|
চন্দ্রাগিরি
Sumanta Gupta2025-03-28T21:29:59+00:00March 28, 2025|
হোয়াইট আর্কেডিয়া এবং মেথুকীর গল্প
Syed Mahmud2025-03-28T21:30:01+00:00March 28, 2025|