ছেলেটি কেঁদেছিল

ছেলেটি কেঁদেছিল
আব্দুর রাজজাক বকুল
বিষ্ঠুপুরের জমিদার বাড়ির অতিথিশালার পুব পাশে ছিল প্রকান্ড এক বকুল গাছ। গাছের গোড়ালী থেকে বৃত্তাকারে প্রায় পঞ্চাশ গজ ভূমি ছিল কেবল বেলে মাটির। মাটি এতোটাই সমান্তরাল ছিল যে, একপলক দেখলেই ভাল লাগা একটা অনুভূতি তৈরি হত মনে মধ্যে। বিশাল সমান্তরাল এক বৃত্তের মধ্যে দৈতের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল গাছটা। ভূমি সমান্তরাল আর বেলে মাটির হওয়ার সুবাদে সাতদিনের বর্ষাতেও এর নিচে পানি বা কাদা জমতো না এক ফোঁটাও। এছাড়া যখন তখন যে কেউ গাছের নিচে ভিড়ে এর ভূমি যাতে নোংরা বা কর্দমাক্ত না করতে পারে তার জন্য আলাদা প্রহরীও ছিল দু’জন। দিনে সামলাতেন দিনেশ কাকা আর রাতে রজনী কান্ত। আমার বকুল ফুল প্রীতির কথা জমিদার স্বয়ং অজয় যাদবেরও অজানা ছিল না। সে জন্য বিশেষ ব্যাবস্থায় এ এলাকার মধ্যে এক আমি ছাড়া আর কেউ ভিড়তে পারতো না বকুল তলায়। সে হলে কী হবে, মেয়ে মানুষ হলেও আমার জন্য সময়টা ছিল নির্দিষ্ট। ভোর হবার আগে শেষ রাতের ফুলগুলোই কেবল জুটতে পারে আমার কপালে। পাড়ার ডানপিটে ছেলেমেয়েদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আধো আলো আধো অন্ধকারে ফুল কুড়োনো কর্মটি সারতে হবে আমাকে। নিয়ম সবার জন্য এক হলেও আমার ক্ষেত্রে ঈষৎ শিথিলতার মূল কারণ ছিল চিরকুমার জমিদার বিজয় যাদব এবং তাঁর ছোট ভাই বিপত্নাীক অজয় যাদবের আমার প্রতি অসম্ভব স্নেহশীলতা। এ পাড়ায় আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা জমিদার বাড়ির উঠোন মাড়ানোর সাহস না করলেও আমার ছিল সে বাড়িতে অবাধ যাতায়াত। জমিদার বাড়ির পাইক, পেয়াদা থেকে শুরু করে ঝি চাকরদের পর্যন্ত পরিচিত মুূখ ছিলাম আমি। গায়ের রং কিংবা একটু চাঞ্চল্যতার জন্যই কী না জানি না, দু’একজনের চক্ষুশূল ছাড়া বাকী সবার কাছেই আমি ছিলাম অতি আদরের। শেষ রাতে লোক চক্ষুর অন্তরালে একাকি বকুল তলায় গিয়ে ফুল কুড়িয়ে ঘরে ফেরা ছিল আমার নিত্যদিনের অভ্যেস।
একদিন মাঝরাতের দিকে একটু জোরে বাতাস হল। বর্ষাকালে মাঝরাতে একটু জোরে বাতাস মানে আলাদা ব্যাপার। আমার চঞ্চল মনে বাড়তি আনন্দের যোগ। কারণ, ভোরবেলায় বকুল তলার ভূমি থাকবে ফুলে ফুলে সাদা হয়ে। আমি একটা একটা করে ফুল কুড়িয়ে আমার কোঁচা ভরাব। এক সাথে অনেকগুলো মালা গাঁথব। আমার সারা ঘর মৌ মৌ করবে তাজা ফুলের সুবাসে। আশ্চর্য এক ধরণের ভাল লাগা তখন পেয়ে বসবে আমাকে। আমাকে পাগল করে দেবে। আনন্দে আমি হাওয়ায় ভাসাতে থাকব। মা হাসি হাসি মুখে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমার আনন্দে ভাগ বসাবেন।
সেদিন ঘুম থেকে জাগতে একটু দেরিই হল আমার। রাতের ফিরফিরে হিমেল হাওয়ায় ঘুমটা কিভাবে পেয়ে বসেছিল আমাকে জানি নে। জানালা খুলে দেখি অনেকটা ফর্সা হয়ে গেছে পুবাকাশ। রাতজাগা পক্ষীকূল কিচির মিচির করে প্রত্যুষ ঘোষণা করেছে ইতোমধ্যে। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে ধপ করে নামলাম আমি। বাইরের মূল দরজার লাঠি খুলে ঈষৎ গতি নিয়ে হাঁটা দিলাম বকুলতলা অভিমূখে। আমার তখন উৎকণ্ঠা, আজ ঘুম ভাঙ্গতে দেরি হলো। এতোক্ষণে গিয়ে ফুলগুলো পাব তো? রজনী কান্ত কাকার মরা ঘুমচোখ ফাঁকি দিয়ে বিষ্ণু, দিপা, মজনু, কমলারা ফুলগুলো চুরি করে নিয়ে যায়নি তো?
আমার বয়স তখন ষোল পেরিয়েছে সবে। এ বয়সে আমার মতো নবযৌবনা মেয়েরা লোকচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে অনেক কাহিনীর জন্ম দিতে পারে। সবই জানা আমার। আমার পরিবারের। তবু নির্জন ভোর রাতে বকুলতলায় একাকি ঘন্টা ধরে ফুল কুড়োতে আমার ক্ষেত্রে কোন নিষেধ ছিল না।
হাতে গোনা যে দু’চারজন ছিল সৌভাগ্যক্রমে তারাও ছিল চাষা ও গোমূর্খ। আমার মতো সাহসী মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দু’একটা রোমাঞ্চকর কথা বলার মতো বুকের পাটা যে তাদের হবে না এ সবার জানা। আমার বদ্ধমূল ধারণাটাই শেষ পর্যšত্ম সত্যিতে পরিণত হল। বকুলতলার ফুলশূন্যতা আমার মন খারাপের অতিরিক্ত কারণ হল। ছিটে ফোঁটা একটা ফুলও নেই কোথাও। কে যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অথবা চুরি করে নিয়ে গেছে এরই মধ্যে। নৈশপ্রহরী রজনী কাšত্ম কাকার গাঢ় ঘুমের ঘড়ঘড় নাকের গান তখনও চারপাশের বাতাস ভারী করছে। তাকে জাগিয়ে ফুল চুরির কথা জিজ্ঞেস করার যৌক্তিকতাও সমর্থিত হল না নিজের কাছে। অগত্যা ভাঙ্গা মন নিয়ে ঈষৎ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেদিনের মতো ফুলশূন্য হ¯েত্ম বাড়ির পথ ধরতে হল আমাকে।
পরদিন আর আগের মতো ভুল নয়। যখন জাগলাম তখন সামান্য ফিকে ধরেছে পুবাকাশ। চারিদিক নীবর বি¯ত্মব্ধ। পাখিরাও নিঃশব্দে ঘুমের দেশে। এটাকে প্রভাতী রাত বলে চালিয়ে নেয়া যায় অনায়াসে। চুপিচুপি একাকি পৌঁছুলাম বকুলতলায়। কিন্তু কপালে দুর্ভাগ্য থাকিলে তাহা রম্নধিবে কে? সে রাতেও ফুল কুড়োতে গিয়ে হতাশ হতে হল আমাকে। এ যেন আগের রাতের চিত্রের পুনরাবৃত্তি। সেই ফুলশূন্য বকুলতলা, সেই রজনী কাšত্ম কাকার ঘড়ঘড় নাক ডাকা ঘুমের গান, সেই ফিরফিরে হিমেল প্রকৃতি। বেশ অনুমান হল, আমার ওপর পরিকল্পিত ভাবে টেক্কা খাটাচ্ছে কেউ। আমি ঘুম থেকে জাগার আগেই ফুলগুলো কুড়িয়ে সাবাড় করে নিয়ে চলে যাচ্ছে আপন আলয়ে। কিন্তু কে সেই অদৃশ্য মানব অথবা মানবী? আমার সাথে তার কী নিয়ে দ্বন্দ? সাতভোরে আমার উৎফুলস্ন মন ভাঙ্গানোর মধ্যে তার কী স্বার্থ নিহিত? যৌক্তিক কিছু আঁচ করতে পারলাম না আমি। আগের রাতের মতোই বিষন্ন বদনে পা বাড়ালাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। সিদ্ধাšত্ম নিলাম, কালই এর একটা সুষ্ঠু রফা হবে। ফুলচোর কেউ একজন আছে বটে। সে যেই হোক, মাত্র চব্বিশ ঘন্টা পরে তাকে অবশ্যই হতে হবে আমার মুখোমুখি। জমিদার কাকার কঠোর শাস্তির দ্বারে তাকে উপস্থিত এই হতে হল বলে। ফুলচোরের বিরম্নদ্ধে নালিশ করলে তার পার পাবার রা¯ত্মা যে অতি সরম্ন তা আমার চেয়ে আর কে ভাল করে জানে?
তৃতীয় রাতের চিত্রের বর্ণনা। ঘুমহীন সারারাত জেগে কাটালাম কথিত ফুলচোরকে ধরবার প্রত্যাশায়। মনের গহীনে তখন আগের দু’রাতের মতো ভুল না করার দৃঢ় প্রত্যয়। খানিক রাত হাতে রেখেই বিছানা ছেড়ে ঘোর অন্ধকারে একাকি চুপিচুপি হাঁটা দিলাম নির্জন বকুলতলার উদ্দেশ্যে। সে রাতে বোধ হয় পূর্ণিমা ছিল। আকাশ জুড়ে বিশাল চাঁদ উঠেছিল থালা মতো। চাঁদটা হেলে পড়েছিল পশ্চিমাকাশে। ঈষৎ হিমেল হাওয়ায় আমার শরীরের সম¯ত্ম লোমকূগুলো জেগে উঠেছিল। আমার শরীরে তখন ফিনফিনে পাতলা আকাশী রং-এর থ্রিপিচ। প্রতিবেশিদের বাড়ির পাশ ঘেঁষে সুরম্ন গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খেয়াল হল ফুল চোরকে ধরার চিšত্মায় ওড়না বাড়িতে ফেলে এসেছি ভুল করে। ওটা শরীরে আছে কী নেই সেদিকে খেয়াল ছিল না মোটেও। যখন খেয়াল হল তখন সলজ্জে আমার মরে যাবার জোগাড়। কিšত্মু কিছুদূর চলে এসেছি বলে ওটা আর উল্টোপথে গিয়ে নিয়ে আসার চিšত্মা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম।
জমিদার বাড়ির বকুল গাছটা প্রকান্ড এবং এর ডালগুলো বি¯ত্মৃত হওয়ায় এক দিনের প্রথম প্রহর ছাড়া কখনও রোদের মুখ দেখে না এর সমতল ভূমি। ফলে খাঁড়া দুপুরেও ছায়ায় মুড়ে থাকে জায়গাটা। এই সাধারণ সূত্রে, রাতের পূর্ণিমা থাকলেও অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকার কথা বকুলতলাটা। বকুল গাছের পশ্চিম পাশে দোতলা জমিদার বাড়ির অবস্থানের কারণে শেষ রাতের পূর্ণিমার আলো বকুল তলায় পৌছার কথা না। সঙ্গত কারণে বকুলতলাটা অন্ধকারে ডুবে থাকার কথা। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে সেখানে গিয়ে দেখা গেল আলাদা চিত্রের প্রদর্শনী। বাম হাতের তালুতে ছোট্ট সরষের তেলের কুপি ধরে মৃদু আলোয় সদ্য যুবক বয়সী অপরিচিত একটা ছেলে কোমর উবু করে নিবিষ্ট মনে একটা একটা করে ফুল কুড়োচ্ছে। পাশে বিছিয়ে রাখা গামছায় ফুলগুলো জড় করছে। ছেলেটার চারপাশে গাঢ় কাল অন্ধকার। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে একটা আলোর টুকরো মাটি থেকে দুই হাত উঁচুতে শূন্যের ওপর এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করছে। ছেলেটাকে তখন কারো নজরে পড়বে না। ভীতু লোক হলে আলোটাকে ভূতের কান্ড ভেবে পালানোর পথ খুঁজবে। কিন্তু এ দৃশ্যটা আমার কাছে অন্যরকম মাত্রা পেল। এ যেন কোন এক ডকুমেন্টারী ছবির চিত্র। অসাধারনত্বে ভরপুর। দৃশ্যটা আমাকে এতোটাই বুঁদ করে ফেলেলো যে আমি ছেলেটার পেছনে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হলাম। নিবিষ্ট মনে ছেলেটার কর্মকান্ড উপভোগ করতে লাগলাম। গত দু’দিন ধরে ফুল চোরকে পাকড়াও করে শা¯িত্ম প্রদানের যে পরিকল্পনা মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছিল তা মুহূর্তেই উবে গেল কোথায় যেন।
ছেলেটার পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী আর ধুতি। মাথার চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। আমি দাঁড়িয়ে আছি ছেলেটার ঠিক পেছনে। দু’জন একইমুখী হবার কারণে পেছন থেকে আগন্তুকের মুখ দেখার কোন সুযোগ নেই। কুপির মৃদু আলোয় ছেলেটার ঘাড়ের ত্বক দেখে ধারণা হলো সে খুব ফর্সা হবে। শরীর স্বাস্থ্যে পুষ্ট। ছেলেটা যে কোন বনেদি ঘরের হবে এ সহজেই অনুমেয়। সে যাক, এই ছেলেটাই যে গত তিন রাত ধরে আমার বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে এটা আন্দাজ করতে ন্যূনতম বেগ পেতে হল না আমাকে। আমার ঈষৎ রাগ উঠল ছেলেটার ওপর। কিšত্ম তার সামনে দাঁড়িয়ে দু’চারটে কড়া কথা বলব এ সাহসও হল না। অন্যদিকে আগন্তুকের একবার মুখ দর্শন না করে ফিরে যেতেও ইচ্ছে করল না। আমি ছেলেটার পেছন দিকে ফেরার প্রত্যাশায় মাথা নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
অবশেষে আমার প্রত্যাশারই জয় হল। একটু পর উবু হয়েই পেছন দিকে ঘুরল ছেলেটা। উল্টোদিকে পায়ের কাছের ফুলগুলো কুড়োতে গিয়ে আমার মেয়েলি খালি পা’র দিকে নজর পড়ল তার। কিন্তু সামান্যতম ভয় কিংবা আশ্চর্য হওয়ার কোন চিহ্ন ধরা পড়ল না তার অভিব্যক্তিতে। যেন কিছুই হয়নি কিংবা এটা একটা সাধারণ ঘটনা এরকম ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে কোমর সোজা করল ছেলেটা। তার বাম হাতের তালুতে ধরা সরষের তেলের কুপিটা আ¯েত্ম আ¯েত্ম ওপর দিকে তুলল। আমার ঠিক সম্মুখে এনে ধরল। লজ্জাবনত চাহনীতে চোখ খুললাম আমি। মুহূর্তের জন্য। একটা ঘুমহীন ঝলমলে সুন্দর মুখ দেখতে পেলাম এক পলক। ইচ্ছের বিরম্নদ্ধে হলেও বেশিড়্গণ তাকিয়ে থাকার সাহস হল না আগšত্মকের দিকে। লজ্জায় আপনাতেই নুইয়ে এল মাথাটা।
ছেলেটা অল্প সময়ের মধ্যে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমস্ত শরীরে একবার বুলিয়ে নিল তার চোখ দুটো। ঠিক তখনই হঠাৎ আমার মনে হল আসার সময় ওড়না ফেলে এসেছি বাসায়। আমার শরীর জুড়ে এক পাতলা জামা ছাড়া আর কিছুই নেই। এ কথা মনে হতেই মাত্রাতিরিক্ত লজ্জা পেয়ে বসল আমাকে। আমার মাথা ঝুঁকে পড়ল সম্মুখের দিকে।
অনেকটা রাগ হল নিজের ওপর। নিজের উড়নচন্ডি স্বভাবী মনের ওপর। আমি একদম স্থির হয়ে থাকলাম। একটা টু শব্দও বের হল না মুখ দিয়ে। যেন কেউ কুলুপ এঁটে দিয়েছে আমার মুখে। পরিস্থিতি এমন হল যে হুট করে সেখান থেকে চলে আসাও সম্ভব নয়। আমার অবস্থাটা ঠিক দাঁড়িয়ে গেল জালে আটকে পড়া মাছের মতো। যে কেবল ছুটোছুটি করতে থাকে প্রাণটা বাঁচানোর জন্য। শেষ পর্যন্ত যখন তারও সম্ভবনা ভেস্তে যায় অগত্যা তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইতে হয়। আমিও তাই করতে থাকলাম। আবার অস্বস্তিও বোধ করতে লাগলাম।
আমার অস্বস্তির কারণ বোধহয় অনুধাবন করতে পারলো বুদ্ধিমান ছেলেটা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কারণে হোক কিংবা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কারণেই হোক ছেলেটা আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে ঈষৎ মুচকি হেসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, আমি জানি আপনি চারুশীলা।
আমার গলায় তখন তীব্র পানি শূন্যতা। চোখে অতিমাত্রায় বিষ্ময়। এই নির্জন গভীর রাতে জমিদার বাড়ির বকুলতলায় দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা যুবকের কণ্ঠে নিজের নাম শুনে আমার বিষ্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে যাবার মতো অবস্থা হল। অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় কিংবা বিষ্ময় যেই হোক না কেন এ নিরেট বাস্তব। আমি বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও আগন্তুকের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকলাম হা করে।
ছেলেটার মুখমন্ডলে তখন আমাকে বোকা বানানোর হাসি। একটু পর চৈতন্য ফিরে এল আমার মধ্যে । আমি নিজেকে সামলিয়ে নিলাম। আমতা আমতা করে শুকনো গলায় বললাম, কিন্তু আ…আপনাকে তো…।
আমার বাক্য সম্পূর্ণ হল না। ছেলেটা যেন আমার হাজার জনমের পরিচিত, এরকম ভঙ্গিতে আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজের অবস্থানেই অটুট থাকল। তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, চারুশীল নামটা বড্ড সেকেলে।
আমার মধ্যে তখন কিছুটা সতেজতা ফিরে এসেছে। আমি তার কথার রেশ ধরে বললাম, এতে আমার কোন বিরোধিতার সুযোগ ছিল না তখন। পিসি শখ করে এ নামটাই কপালে জুড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার জন্মে সময়। নামটা বোধহয় ঠিক পছন্দ নয় আপনার।
‘না না ঠিক তা নয়। আপনার পিসির প্রতি শ্রদ্ধা নিয়েই বলছি, এতে কেবল আমার আপত্তির মাত্রা সামান্যই।’ সহাস্যে জবাব দিল ছেলেটা।
আমার নাম নিয়ে ছেলেটার হঠাৎ এ আপত্তির যৌক্তিকতা আমার মাথায় ঢুকল না ঠিক মতো। আমি আবার হা করে তাকিয়ে থাকলাম ছেলেটার মুখের দিকে। আগের মতোই। সময় খরচ করল না ছেলেটা। ডান হাত নেড়ে চটপট করে বলল, আচ্ছ আপনার নামটা ছেঁটে দিই। আমার সামনে আপনি এখন থেকে চারুশীলা নন। শুধু শীলা।
আমি আপত্তি তুললাম, আপনার কথায়?
ছেলেটা হেসে ফেলল, স্থায়ীভাবে নয় তো। মাত্র চারদিনের জন্য।
আমার বিষ্ময় বাড়ল, চারদিনের জন্য কেন?
ছেলেটা আবার হাসল, সেটা না হয় রহস্যাবৃত্তই থাক?
আমি আবার চুপ হয়ে গেলাম, আমার মস্তিষ্কে অন্য রহস্য জট পাকাতে শুরু করল।
কে এই ছেলেটা? আমার নাম জানল কী করে? আমাকে নিয়ে তার মধ্যে এতো আগ্রহই বা কেন? অদৃশ্য এক লজ্জায় আবারও চুপসে গেলাম আমি। আমার এ লজ্জার বাহ্যিক কারণও ধরে ফেলল আগন্তুক। আমার চুপসে যাওয়া মুখে যেন পানি ছিটিয়ে দিল, আমাকে চেনার কথা না আপনার। আমি রঘুনাথ। জমিদার বিজয় যাদব আর অজয় যাদব আমার মামা। পরশু কোলকাতা থেকে এসেছি বেড়াতে।
রঘুনাথের ছিটিয়ে দেয়া পানিতে আমি মুহূর্তেই তাজা হয়ে উঠলাম। আমার মুখে বাতাস ঢুকল। মুখের কপাট খুলল। আমি ঈষৎ অনুযোগের সুরে বললাম, এসেই বুঝি আমার সর্বনাশ করতে শুরু করেছেন?
বুদ্ধিমান রঘুনাথ আমার অনুযোগের হেতুও ধরে ফেলল, সে জন্য ক্ষমা চেয়ে নিজেকে ছোট করা ছাড়া আমার গত্যান্তর নেই। আমি জানি, প্রত্যুষের তাজা ফুলগুলো কেবল আপনার নামেই বরাদ্দ। কিন্তু আপনার এ অনিষ্ট করা ছাড়া আমি অন্য কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আশেপাশে তেমন কোন সুগন্ধী ফুলটুলের গাছও নেই। তাই কৌশলে আপনার বাড়া ভাত চুরি করে খেতে হচ্ছে।
আমি হেসে ফেললাম, বকুল ফুল বুঝি আপনার খুব প্রিয়?
‘আপনার মতো না। আসলে প্রতি প্রত্যুষে মা লক্ষীর চরণে ফুল না দিয়ে খানিক্ষণ পূজো না করলে আমার দিন শুরু হয় না।’
‘যুবক বয়সেও দেখছি ধর্মটর্ম করেন?’
‘ছোট থেকে এ অভ্যাসটা আমার যায়-নি। বাবা মা’র কাছ থেকে পাওয়া। আমাদের পরিবারে ধর্মের খুব চর্চা। কেন এদিকটায় ধর্ম চর্চায় ভাটা আছে নাকি?’
‘নেই আবার! অথচ আপনার বয়সী আমাদের পাড়ার বিষ্ণু, দেবু, মহীদের দেখুন। বিড়ি, ভাং খেয়ে দিনমান এর অনিষ্ট তার অনিষ্ট। বছরেও মা লক্ষীর নামটি পর্যন্ত একবার মুখে ওঠে না।’
‘ধর্ম কর্ম আসলে জোর করে হবার জিনিস না।’
‘আপনার মামাদের দিয়ে অবশ্য এ কথাটির সত্যতা মেলে।’
‘বেশ ধরেছেন দেখছি। ’
আমার আর রঘুনাথের কথাবার্তা আর বেশিদূর এগোতে দিল না দমকা হাওয়া। তার বিরোধীতার কাছে পরাস্ত হয়ে পরাজয় বরণ করল রঘুনাথের হাতে ধরা সরষের তেলের ছোট্ট কুপিটা। ফলে আয়ু থাকলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হল কুপিটার সোনালী অগ্নিশিখাকে। এ কারণে পুবের ফিকে আলো প্রত্যুষ ঘোষণার সুযোগ পেল। বাড়ি ফেরার জন্য আমি ছটফট করতে লাগলাম ভেতরে ভেতরে। কিন্তু কী এক কারণে যেন রঘুনাথের সামনে থেকে একদন্ডও সরতে ইচ্ছে করল না আমার। আমি চাইলেও সে যে সম্ভব না এ আমার জানা। পাড়ার লোকজনের বাজে কথাকে তোয়াক্কা না করার মতো দুঃসাহস আমার কবে থেকে হল? আমি ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বললাম, আর কতদিন এভাবে আমার অনিষ্ট করবেন বলে স্থির হয়েছে?
রঘুনাথ উদাস ভঙ্গিতে বলল, ইচ্ছে থাকলেও বেশি দিন সময় পাচ্ছি কোথায়? পরীক্ষা শেষ তাই সাতদিনের ছুটি বরাদ্দ। আজ দিয়ে তিনদিন পার হচ্ছে।
রঘুনাথের এ কথা শুনে আমার বুকের গহীনে ধক্ ধক্ করে উঠল। কেন জানি না আমার বিক্ষিপ্ত মনটাও ভীষণ খারাপ হল। রঘুর এখানে অবস্থানের মেয়াদ আর মাত্র চারদিন? আমার মুখ মন্ডল বিষন্নতায় ভরে গেল। আমি বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়ালাম, আচ্ছা আজ চলি?
আমার এ কথায় রঘুর চোখ দুটো কেমন চকচক করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সামান্য অসহায়ের মতো দেখাল তাকে। সম্ভবতঃ আমাকেও না ছাড়ার ইচ্ছে তার মনের অভ্যন্তরে। সে ভাব খুব একটা ধরতে দিল না চালাক রঘুনাথ। কেবল পেছন থেকে সামান্য মোলায়েম সুরে বলল, কাল আবার আসছেন তো?
রঘুনাথের এ কথার কোন উত্তর দিলাম না আমি। মাথা নিচু করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দ্রুত পা চালালাম বাড়ির উদ্দেশ্যে।
শেষের রাস্তাটুকু প্রায় এক দৌড়েই চলে এলাম বাড়িতে। উত্তেজনা আর অজানা এক শিহরণে ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকলাম আমি। আমার শরীর জ্বর ছাড়ার মতো ঘামতে শুরু করল। পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না বেশিক্ষণ। বিছানায় এলিয়ে দিলাম দুর্বল শরীরটা। ভাঙ্গতে থাকলাম নিজের মধ্যে। ভাঙ্গতেই থাকলাম। হুট করে ভিন্ন এক ধরনের আবেশ যেন বশ করে ফেলল আমাকে। রঘুনাথের সুন্দর মুখ, সুন্দর হাসির প্রতিচ্ছবি সারাক্ষণ আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল। বাকী রাতটাতে কিছুতেই ঘুম এলো না দু’চোখ জুড়ে। এ কী হল আমার? এরকম তো কখনও হয় না? জীবনে এই প্রথমবারের মতো রঘুনাথ কী আমার সবুজ মনকে নাড়া দিয়ে গেল?
দিনমান কাটল ঘোরের মধ্যে। রাত হল ফের। কিন্তু নিদ্রাদেবীর পাত্তাটি নেই। বিছানায় শুয়ে কেবল এপাশ ওপাশ করলাম। বার বার আয়নায় চেহারা দেখলাম। উদাস উদাস ভাব। কী যেন নেই। কী যেন হারিয়েছি। বুকের মাঝখানে বিশাল এক শূন্যতা। গর্ত। যেন সেখান থেকে রক্তপাত হচ্ছে। অবিরাম।
আমার এহেন ঔদাসীনতা ঠিকই ধরে ফেললেন আমার মা। তখন আমি কপালে হাত তুলে দিয়ে আনমনা ভঙ্গিতে খাটে শুয়ে আছি। মাঝরাতের দিকে মা বাথরুম সেরে এসে আমার ঘরে উঁকি দিলেন। দেখলেন আমি চিন্তিত ভঙ্গিতে শুয়ে আছি বিছানায়। ঘরে হারিকেন জ্বলছে দপদপ করে। মা আদর করে আমার দু’বাহু ধরে আমাকে খাটে বসালেন। মা’র চোখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম আমি। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, কী হইছে? হইছে কী তর?
আমি কোন উত্তর করলাম না। মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে থাকলাম মাথা নিচু করে। আমার মাথার মধ্যে তখন গিজগিজ করছে কেবল একটাই শব্দ, রঘু, রঘুনাথ। রঘুনাথ। রঘুনাথ। মা আমাকে কোন রকম প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করলেন না। পরম মমতায় ফের বিছানায় শুইয়ে দিলেন। আমার গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিলেন। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার কথা বলে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু আমার চোখে ঘুম এলো না। আমি জেগে থাকলাম। প্রতিক্ষায় থাকলাম।
ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের ডানপিটেমি স্বভাব আমার মধ্যে ছিল। আমার বয়স যখন বার হল, মা বললেন, এখন বড় হয়েছিস। ওসব ছাড়, ওদেরকে ছাড়। আমি ছাড়লাম। ছেলেদের সাথে খেলাধুলো ছাড়লাম। মাছ ধরা ছাড়লাম। পুকুরে ডুব সাঁতার ছাড়লাম। বিষ্ণু, অশোক, মনিশা এদেরকে ছাড়লাম। তবু কেন জানি না, আমাকে বাড়ির ভেতর এক রকম কুক্ষিগত করে রাখা হল। কিন্তু সব কিছু কী ছেড়ে থাকা যায়? আমি সারাক্ষণ বাড়ির ভেতর থাকি কিন্তু আমার সোনালী মন ঠিকই বনে বাঁদাড়ে দৌড়াদৌড়ি করে, বৌছি খেলে, পুকুরে মাছ ধরে। বাইরের কোন পুরুষ মানুষের সাথে কথা হয় না আমার। মিষ্টি সুরে কোন কোকিল ডাকে না। আমার উদাস মনটা ছটফট করতে থাকে ভেতরে ভেতরে। মনে হয় সবকিছু ভেঙ্গে ফেলে শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাই মুক্ত আকাশে। প্রাণ ভরে শ্বাস নিই, প্রকৃতির ঘ্রাণ নিই। শেষ পর্যন্ত তা করা যায় না আমার। এর ফাঁকে কখন যে আমার বয়স ষোলতে পড়েছে টেরই পাইনি। ফুলের প্রতি প্রচন্ড রকম নেশা আসে। ফুলপ্রীতি কী খুব অন্যায়?
অদৃশ্য কোন এক শক্তির উদাত্ত আহবানে পরদিন ভোর রাতে ফের ছুটে গেলাম বকুলতলায়। দেখা গেল আগের মতো সেদিনও রঘুনাথ বাম হাতে সরষের তেলে কুপি নিয়ে একটা একটা করে ফুল কুড়োচ্ছে। আমি চোরের মতো নিঃশব্দে ওরে পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার মনে তখন অন্যরকম অনুভূতির আঁকিবুকি। রঘুনাথ আমাকে চিনল কীভাবে, আমার নাম জানল কী করে, আমার বকুল ফুলপ্রীতির কথা শুনল কার কাছে এসব তখন আমার কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কোন ঘটনা না।
শত সাবধানতা সত্ত্বেও আমার উপস্থিতি টের পেল রঘুনাথ। ফুল কুড়ানো বাদ দিয়ে আমার দিকে ফিরল। ঈষৎ হাসি দিয়ে বলল, আমি জানতাম আপনি আসবেন। আমি চুপ করে থাকলাম।
রঘুনাথ আবার বলল, আচ্ছা এই ঘোর অন্ধকার রাতে একাকি এখানে আসতে আপনার ভয় করে না?
আমি চুপ করে থাকলাম।
‘এরকম পল্লী গ্রামে এমন সাহসী মেয়ে আছে ভাবাই যায় না। আমাদের কোলকাতার দু’একটি ঘটনা শুনলে তো ভয়ে আপনি শিউরে উঠবেন। ’
আমি চুপ করে থাকলাম।
হঠাৎ প্রসঙ্গের মোড় ঘোরাল রঘুনাথ। তড়িঘড়ি করে পুলকিত হৃদয়ে আগ্রহভরা কন্ঠে বলল, আচ্ছা ভোরের সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে আপনার ভাল লাগে?
আমি হঠাৎ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললাম, জ্বী।
‘আপনি কী এখন খোলা মাঠে আমার সাথে হাঁটবেন?’
‘জ্বী’
‘আপনার কোন সমস্যা টমস্যা নেই তো?’
‘জ্বী না।’
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে গেলাম। আশ্চর্য, আমাদের শরীরে কোন ক্লান্তি নেই। রঘুনাথ আমার হাত ধরল। আমরা হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি দু’জন হাঁটতে থাকলাম। রঘুনাথ কয়েকটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাল আমাকে। ওর আবৃত্তির মধ্যে অসম্ভব এক মাদকতা আবিষ্কার করলাম আমি। ভাবালুতায় বুঁদ হয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে রঘুর মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। নিজের অজান্তেই নিজেকে চুপচাপ সমর্পন করতে থাকলাম।
ফেরার সময় ভোর হয়ে গেল চারিদিক। রাখাল মাঠে বের হল লাঙ্গল হাতে। মাঝি পাল তুলে দিল নৌকায়। পুবেল হাওয়ায় কাঁপন শুরু হল বুকের গহীণে। আমার জামা, ওড়না, চুল বাতাসে উড়তে থাকল। রঘু নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আমার চোখের দিকে। আমিও রঘুর দিকে। শেষে দু’জনেই লজ্জা পেয়ে আনত মুখে পরস্পরের হাত ধরে নিঃশব্দে বাড়ির দিকে এগুতে থাকলাম।
এরপর অপ্রত্যাশিত ভাবে যে বিয়োগান্তক কাহিনীর জন্ম হল তার জন্য মানসিক ভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি, কিংবা রঘু। বলতে গেলে ঘটনাটা যেমন আকস্মিক তেমনি অনাকাঙ্খিত। ফেরার পথে বড় রাস্তার মুখে উঠতেই আকস্মিক ভাবে আমাদের সামনে দানবের ভঙ্গিমায় এসে দাঁড়ালেন প্রতাপশালী জমিদার বিজয় যাদব। সাথে সঙ্গীয় জনা দশেক স্বাস্থ্যবান লাঠিয়াল। ভোর বেলা হাওয়া খেতে এসে আচমকা আমাদের সম্মুখে পড়েছেন তিনি। জমিদার কাকাকে দেখে ভয়ে আমার অন্তরাত্মা যেন বেরিয়ে গেছে এমন হল। তেষ্টায় কাঠ হয়ে এল বুকের অভ্যন্তর। জমিদার কাকা কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। যেন জ্বলন্ত আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরুচ্ছে তাঁর রক্তাভ চোখ দিয়ে। অগ্নিমুর্তি ধারণ করেছেন তিনি। সাক্ষাত দৈত্যের মতো। ভয়ে ঢোক গিললাম আমি আর রঘুনাথ। শক্ত করে ধরলাম পরস্পরের হাত। কোন বাক্য ব্যায় করলেন না বিজয় যাদব। দ্রুত আমার সম্মুখে এসে রাগান্বিত অভিব্যক্তিতে আকস্মিক ভাবে ঠাস ঠাস করে দু’হাতে কয়েকটা চড় বসালেন আমার দু’গালে। আমার চোখ দিয়ে এক সাথে কয়েক হাজার জোনাকী পোকা বেরিয়ে গেল মুহূর্তেই। মাথাটা ঝিমঝিম করতে শুরু করল। প্রকৃতিটা দপ করে নিভে গেল যেন। জ্ঞান হারানোর কথা থাকলেও অদৃশ্য কারণে জ্ঞান হারালাম না আমি। কেবল শুনতে পেলাম জমিদার কাকার কয়েকটা বিষবৎ প্রলাপ, শয়তান মেয়ে! এতো দিন তোমাকে ভাল মেয়ে বলেই জানতাম। আমার একমাত্র ভাগ্নের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর মতো দুঃসাহস তোমার হল কী করে? প্রাণের প্রতি মায়া নেই তোমার? শুনে রাখ, দ্বিতীয় বার যদি রঘুর সাথে তোমাকে দেখি তাহলে তোমার জ্যান্ত কবর হবে। তোমার শরীর শেয়াল কুকুরের খাবারে পরিণত হবে।
আমার মাথার মধ্যে তখন ভীষণ ভাবে টনটন করছিল। জমিদারের কথাগুলো শুনতে পেলাম ঘোরের মধ্যেই। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকল না, যে জমিদার কাকা আমাকে এতো ভালবাসতেন তিনি সামান্য ব্যাপারে আজ আমার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করলেন কেন? আমাকে সহজ ভাষায় বললেই তো চলতো রঘুর সাথে কোন কথা বা যোগাযোগ আমার চলবে না। এর জন্য একজন ষোড়শী যুবতীর গায়ে লোকজনের সামনে এভাবে হাত তুলতে হবে কেন? লজ্জায়, রাগে, দুঃখে, অপমানে আমি এতোটুকু হয়ে পড়লাম। আমি জানি, আজকের ঘটনার জন্য আমি তেমনটা দোষী নই।
রঘুকে আমি বাইরে যাবার প্রস্তাব করিনি। ওর হাত ধরিনি। রঘুই সব করেছে। তবু কেবল আমাকে একাই শাস্তি পেতে হল কেন? আমি ঢুলঢুল চোখে তাকিয়ে থাকলাম রঘুর চোখের দিকে। আমার চোখে কোন জল নেই কিন্তু অবাক কান্ড, জল রঘুর চোখে। রঘু আমার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে অশ্রু বিষর্জন দিচ্ছে।
আমার আশ্চর্য লাগে, জমিদার কাকা রঘুকে কিছুই বলেননি। কোন প্রশ্নবাণেও বিদ্ধ করেননি। যা করেছেন আমার ওপরই করেছেন। অথচ রঘু কাঁদছে। আমি বুঝতে পারি না রঘুর এ নীরবে কান্নার হেতু কী? কেন এভাবে কাঁদছে রঘু? কাঁদার কথা তো আমার। কিন্তু আমার কান্না সে কেন কাঁদল? আমি অনেক চেষ্টা করেছি রঘুকে একথা জিজ্ঞেস করতে। পারিনি। কারণ সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে একদন্ডের জন্যও দেখা হয়নি রঘুর সাথে আমার। যোগাযোগ হয়নি। অথচ এর মধ্যে কেটে গেছে মহামূল্যবান দশটি বছর। নিষ্ঠুর সময়ের আশির্বাদে এখন আমি অন্যের গৃহকর্ত্রী। স্বামী, সন্তান, সংসার এসবে আমি এখন পরিপূর্ণ মানুষ। সব আছে আমার। সব।
এখনও বর্ষা এলে একমাসের লম্বা ছুটি নিয়ে ছুটে যাই আমি বাবার বাস্তুভিটায়। আমার সেই প্রিয় বিষ্ঠুপুরে। বিষ্ঠুপুরে এখন বাবা নেই, মা নেই। আমাদের প্রিয় বাড়িটা শূন্যই পড়ে থাকে। গ্রামটারও এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ জনের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সে হলে কী হবে, আমার সেই অতিপ্রিয় বকুল গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে বহাল তবিয়তে। আমি বকুল তলায় যাই। গিয়ে খুঁজি আমার রঘুনাথকে। একে ওকে জিজ্ঞেস করি, জমিদার কাকাকে জিজ্ঞেস করি, রঘু কী এসেছিল এ বর্ষায়? আমি না বোধক উত্তর পাই। জিজ্ঞেস করি, রঘু এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? আমি কোন উত্তর পাই না। তবু হতাশ হই না আমি। আমি বলি, আমার মন বলে কোন এক বর্ষাতে রঘু ঠিকই আসবে এখানে। এই বকুলতলায়। এমনি এক বর্ষাতে স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে রঘুনাথের যখন মনে পড়বে আমার কথা, তখন ঠিকই ছুটে আসবে আমার রঘু। আমার সাথে দেখা করতে। এই একটি মাত্র আশা নিয়ে প্রতিবর্ষাতে আমি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়ি যাই। যেতেই হয় আমাকে। যাবই আমি। যতদিন রঘুর সাথে আমার দেখা না হবে ততদিন। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।
শুরু করলে আর নতুন করে কিছু ভাববার প্রয়োজন নেই। জেগে থাকো, হাঁটো কিংবা বিড়ি খাও…
Ismat Shilpi2025-03-30T20:27:10+00:00March 30, 2025|
কুন্টার মুক্তির আনন্দ
Sumon Biplob2025-03-30T10:38:17+00:00March 30, 2025|
গঙ্গা পাড়ের বৃত্তান্ত
Priyojit Ghosh2025-03-29T12:19:22+00:00March 29, 2025|
আমি ও জ্যোতি পোদ্দার
Jyuti Podder2025-03-30T09:42:15+00:00March 29, 2025|
চন্দ্রাগিরি
Sumanta Gupta2025-03-28T21:29:59+00:00March 28, 2025|
হোয়াইট আর্কেডিয়া এবং মেথুকীর গল্প
Syed Mahmud2025-03-28T21:30:01+00:00March 28, 2025|