ফিরে আসার পথ অজানা
নাহিদ হাসান রবিন
দিনের আলো যখন আস্তে আস্তে মুছে গিয়ে আকাশের গায়ে নীলচে অন্ধকারের রং লেগে থাকে, তখন পৃথিবী যেন আরো নিঃশব্দ হয়ে ওঠে। সেই নীরবতার ভিতরেই শিমুল বসে থাকে ছোট্ট ঘরের কোণায়, দু-হাতের আঙুল একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে। তার চোখের তলানিতে জমে থাকা ক্লান্তি যেন সূর্যাস্তের পরে ফেলে যাওয়া শেষ রঙটুকুর মতো অস্পষ্ট, ঝাপসা, কিন্তু গভীর।
তিথির কণ্ঠস্বর অনেক দিন তার শক্তি ছিল। দিনে রাতে সেই মায়াময় স্বরই যেন শিমুলের সমস্ত অস্থিরতা শুষে নিতো। অথচ এখন মনে হয় সেই সুরের সেতুটা কোথাও গিয়ে ভারসাম্য হারাচ্ছে। তিথি আর আগের মতো নয়। তার কথার মাঝে লুকিয়ে থাকে কোনো অদেখা দ্বিধা, কোনো অব্যক্ত শঙ্কা। শিমুল তা টের পায়। এবং সেই টের পাওয়াটাই তার অসুখকে আরও গভীর করে তোলে।
ডাক্তারের কাছে গিয়ে শিমুল যখন শুনল- ঔষধে কিছু হবে না। এই ছেলেটা হারিয়ে গেছে নিজের মনোজগতের অন্ধকারে। ওকে টেনে তুলতে পারবে শুধু একজন, যাকে সে সবচেয়ে বেশি চায়। তখন শিমুলের বুকের ভেতর যেন একটা অদ্ভুত আলো ফুটে উঠেছিল। সে তো জানে, তার চাওয়ার তালিকায় একটিই নাম আছে তিথি। কিন্তু তিথি? সে কি আসবে?
তিথির মন এখন ঠিক একটি ঝড়বিহীন সমুদ্রের মতো, উপর থেকে শান্ত, কিন্তু গভীরতায় অস্থির ঢেউ লুকিয়ে থাকে। সে জানে শিমুলের মন ভেঙে যাচ্ছে। জানে তার এক নাগাড়ে শূন্যতা, অপার দহন, অসহনীয় অস্থিরতা। তবুও সে এগিয়ে আসে না। তার মনে প্রশ্ন জন্মায়, সে কি সত্যিই কাউকে উদ্ধার করার মতো শক্তি রাখে? নাকি শিমুলের ভাঙনের ভিতর ঢুকলে সে নিজেও ভেঙে যাবে?
রাতে যখন তিথি আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে, তার মাথার ভিতরে শিমুলের ক্লান্ত কণ্ঠ প্রতিধ্বনি তোলে। একদিন শিমুল বলেছিল- তিথি, তোমাকে ছাড়া সবকিছু ফাঁকা। তুমি না এলে আমি বাঁচব না। এই বাক্যটি কারো কাছে সাধারণ মনে হলেও তিথির বুকে তা যেন ভারী পাথরের মতো চাপা পড়ে আছে। ভালোবাসা দায়িত্ব নিতে পারে, কিন্তু কি ভালোবাসাকে দায়বদ্ধতাও নিতে হয়?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিথি প্রায়ই আকাশ দেখে। ন¶ত্রগুলো আলোর বিন্দুর মতো দেখালেও কোনটা কাছে, কোনটা দূরে, এটা বোঝা যায় না। মানুষের মনও কি ঠিক এরকম? শিমুল তার কাছে নাকি দূরে, এই প্রশ্নটাও তিথির মাথায় কুয়াশার মতো ভাসে। অন্যদিকে শিমুলও জানালা খোলা রেখে রাতের আকাশে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, বাতাসের প্রতিটি ঢেউ তিথির দিকে ছুটে যাচ্ছে আর ফিরছে না।
দিনের পর দিন সে অনুভব করে তার ভিতরের শক্তিগুলো ভেঙে যাচ্ছে, যেন কোনো পুরনো দেয়ালে ফাটল ধরেছে আর মাটির নিচে থেকে বেড়ে উঠছে শুকনো শেকড়। সে শুয়ে থাকে, কিন্তু ঘুম আসে না। উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু পা চলে না। কথা বলতে চায়, কিন্তু শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। তিথির নাম উচ্চারণ করতে গেলেই বুকের ভেতর ব্যথার মতো কিছু ছড়িয়ে পড়ে।
তিথি অবশ্য সবই দেখছে। অদেখা কোনো পথে, অশ্রুত কোনো সুরে, সে শিমুলের রোগটাকে অনুভব করছে। তবু সে এগোতে পারে না। ভয় পায়। তার ভয়গুলো ছোট নয়, যেন ছায়ার মতো হাঁটে, তিথির পাশ থেকে সরেও না। সে ভাবে, যদি শিমুলকে জোড়া লাগাতে গিয়ে নিজের ভেতরের কোনো অংশ চিরতরে ভেঙে যায়? সে যতটা দেবে, তার চেয়ে বেশি টানতে হয় তাকে? যদি সে ভালোবাসার ভারে ডুবে যেতে থাকে, আর ফিরে আসার পথ খুঁজে না পায়?
একদিন খুব সকালে, জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশির দেখে তিথির মনে হলো, অল্প একটু ঠাণ্ডা জলও কিভাবে আলো ধারণ করতে পারে। তখন তার মনে প্রশ্ন এলো- শিমুল কি সত্যিই তাকে আলো হিসেবে দেখে? নাকি একটি আশ্রয় হিসেবে? আর আশ্রয় কি এমন কাউকে হওয়া উচিত যে নিজেই ভেতরে ভাঙনের শব্দ শুনছে?
তিথি জানে, ভালোবাসা জীবনে শক্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে সেই ভালোবাসা কখনো ¶তও তৈরি করতে পারে, যদি মানুষ নিজের সীমা না বোঝে।
তার সীমা কোথায়? সে কি শিমুলের ভাঙন ছুঁয়ে তাকে সুস্থতার দিকে টেনে তুলতে পারবে? নাকি শিমুলের ভারে নিজেই একসময় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে? এই দোলাচলই তাকে থামিয়ে রাখে।
সে জানে, তার একটিমাত্র সিদ্ধান্ত শিমুলকে ফিরিয়ে আনতে পারে জীবনের আলোয়। কিন্তু কি সেই একই সিদ্ধান্ত তাকে টেনে নিতে পারে অস্থির অন্ধকারে? এই ভয়ের মাঝেই তিথি দিনের পর দিন কাটায়। সে ভাবে, মনের ভেতরের ভয় যদি দূর না হয়, তাহলে যিনি ভেঙে যাচ্ছেন তাকে শক্তি দেওয়া সম্ভব কি? নিজের ¶ত না সারিয়ে কি অন্যের ¶ত সেলাই হয়?
এক রাতে ঘুম না এসে তিথি উঠে দাঁড়ায়, জানালার পাশে যায়। বাইরে কুয়াশা নেমেছে। আলো-আঁধারের মাঝে সবকিছু অস্পষ্ট। ঠিক যেমন তার মন। হঠাৎ কোথা থেকে যেন মনে হয়, শিমুলও হয়তো একই সময়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম মনে মনে ডাকছে। তিথির বুকটায় একটা হাহাকার নিঃশব্দে উঠে আসে। সে জানে, শিমুলের ভিতরকার আলো নিভে যাচ্ছে। জানে, সে সাহায্য চাইছে। তবুও তিথি এখনো এগিয়ে আসেনি। কারণ সে এখনো ভাবছে। ভাবছে সে কি সত্যিই কারো ভাঙা মন জোড়া লাগানোর মতো শক্তির অধিকারী? নাকি তার নিজের মনেই ফাটল আছে, যা ঠিকমতো দেখা যায় না? সে কি আসবে? নাকি না? প্রশ্নটি বাতাসে ঝুলে থাকে, ঠিক ঠিকানাহীন পাখির মতো। যার জানা নেই কোথায় বসবে, কোথায় উড়বে। আর দুই মন দূরত্বের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে একজন ভাঙা, একজন দ্বিধান্বিত। তাদের মাঝে থাকে নিঃশব্দ এক অনিশ্চয়তা, যা যেকোনো সময় আলোতে পরিণত হতে পারে, আবার ঠিক ততটাই সহজে অন্ধকারেও ডুবে যেতে পারে।
তিথি এখনো আসেনি। কিন্তু ভাবছে, ভেবেই যাচ্ছে। কোন পথে গেলে দুজনের ভেতরের ¶ত বাঁচিয়ে রাখা যায় পৃথিবীর আলোপথে।