ঋণ শোধ

By Published On: March 26, 2025Views: 16

ঋণ শোধ
বাসার তাসাউফ

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম একটি এলাকায় প্রাইভেট হাসপাতালের চেম্বারে বসে আছি। হাসপাতালের গেটে একটা রিকশা এসে থামল। নীল প্যান্ট ও ব্লেজার পরা এক লোক নামল রিকশা থেকে। রিকশায় একজন রক্তাক্ত অশীতিপর বৃদ্ধ লোক বসে আছে। রিকশাওয়ালার সাহায্যে রক্তাক্ত বৃদ্ধকে নিয়ে আমার চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে ব্লেজার পরা লোকটি। তার সিরিয়াল নম্বর ৪৫। বৃদ্ধ লোকটির মাথা থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। সেখানে হাত রেখে রক্ত পড়া বন্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে লোকটি। যে রিকশায় করে বৃদ্ধকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে, সেই রিকশার চালক হাসপাতালের গেট পেরিয়ে একটু দূরেÑ যেখানে বড় সাইজের কয়েকটি মেহগনি গাছ আছেÑ সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধকে ডাক্তার দেখানে শেষ হলে কিংবা হাসপাতালে ভর্তি করতে পারলেই লোকটি যেন চলে যেতে পারে।

সিসি ক্যামেরার মনিটরে আমি দৃশ্যগুলো দেখছিলাম। বৃদ্ধ লোকটির মাথা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে। এভাবে আর কয়েক মিনিট রক্ত ঝরলে রক্তশূন্য হয়ে মারা যেতে পারে। তাই আমার পিএসকে পাঠিয়ে বৃদ্ধকে চেম্বারে নিয়ে এলাম। নীল ব্লেজার পরা লোকটি আমাকে কৃজ্ঞতাস্বরূপ ধন্যবাদ জানালো।

কিন্তু তার কথায় আমার কোনও মনোযোগ নেই। আমার মন, চোখ, এমনকি পঞ্চইন্দ্রীয়জুড়ে এখন বৃদ্ধ। আসলে বৃদ্ধ নয়, জাভেদ কাকা। এই লোকটাকে পঁচিশ বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কোথাও খুঁজে পাইনি। আজ তার সঙ্গে আমার এভাবে দেখা হয়ে যাবে কখনও ভাবিনি। মানুষের জীবনে কত যে বিচিত্র ঘটনা ঘটে যা তার ভাবনার মধ্যে থাকে না। এই যে জাভেদ কাকার সঙ্গে দেখা হলোÑ আমি কি কখনও ভেবেছি এতদিন পর তার সঙ্গে আমার এভাবে দেখা হবে। শেষবার তার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল, তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। আমাদের গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় ছিল সরকারি প্রাইমারি স্কুলটা। পশ্চিমপাড়া ও পূর্বপাড়া মাঝখানে একটা খাল ছিল। চীনের দুঃখ যেমন হোয়াংহু নদী আমাদের পূর্বপাড়ার মানুষের দুঃখও তেমনই এই খালটা ছিল। বর্ষাকালে দুই পাড়ার লোকজন চলাচল করতে হলে নৌকো ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। আমরা সকাল সকাল লাইন ধরে নৌকোয় চড়ে খাল পার হয়ে স্কুলে যেতাম।

সকালে স্কুলে গেলে ফিরতাম বিকেলে। সারাদিন স্কুলেই কেটে যেত। সকাল ও বিকেলের মাঝখানে যে দুপুর বলে একটা সময় আছেÑ তখন যে লাঞ্চ বা টিফিন খেতে হয় তা আমাদের মনে থাকত না। কারণ স্কুলে দুপুরে টিফিন খাওয়ার বিরতি দিলেও আমরা তেমন কিছু খেতাম না। বড়জোর এক টাকা দিয়ে কিনে একটা লাঠি বিস্কুট খেতাম। এখনকার ছেলেমেয়েদের মতো স্যান্ডউইচ, চাওমিন বা নুডুলস অথবা বাসা থেকে নিয়ে আসা নানা রকম মজাদার খাবার খাওয়া কথা আমরা কল্পনাও করতাম না। আমরা স্কুলের পাশের গাছ থেকে আম, জাম বা অন্যান্য ফল পেড়ে খেয়ে টিউবওয়েল থেকে পানি পান করে পেট ভরে নিতাম। মাঝেমধ্যে আইসক্রিমও খেতাম। স্কুল জীবনে টিফিনের সময়ে দুধমালাই আইসক্রিম আমার একমাত্র ফ্যান্টাসি ছিল। টিফিনের ঘণ্টা বাজলে স্কুলের মাঠের উত্তর কোণে মেহগনিগাছের তলে বসে আইসক্রিমওয়াল তার বাক্সে জোরে জোরে বারি দিত। বাক্সের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারতাম আইসক্রিমওয়ালা এসেছে। আইসক্রিম বিক্রি করত জাভেদ কাকা। এক টাকা দিলে চারটা আইসক্রিম দিত। আর আট আনা দিলে দিত দুধমালাই আইসক্রিম। আমার আম্মা চার আনার বেশি দিত না। চার আনাতে দুধমালাই আইসক্রিম পাওয়া যেত না। দুধমালাই ছাড়া সাধারণ আইসক্রিম খেতে আমার ভালো লাগত না। দুধমালাই আইসক্রিম খাওয়ার লোভ সংবরণ করতে না পেরে আমি প্রায়ই আম্মার কাছ থেকে চেয়ে আরও চার আনা নিতাম। না দিলে কান্নাকাটি শুরু করতাম। একবার একসঙ্গে দুটো দুধমালাই আইসক্রিম খেলাম বাকিতে। জাভেদ কাকা বলল, ‘সমস্যা নাই। যেদিন টেহা অইব হেইদিনই দিও। এহন আইসক্রিম খাইতে থাহো।’

জাভেদ কাকা বাকিতে দুধ মালাই আইসক্রিম দিতে লাগল। এমন করে দশ টাকা পাওনা হয়ে গেল সে। দশ টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে আমি আইসক্রিম খাওয়া বন্ধ করে দিলাম। আম্মার কাছ থেকে প্রতিদিন যে পয়সা পেতাম সেটা দিয়ে একটু একটু ঋণ শোধ করতাম আর পয়সার অভাবে দুধমালাই খেতে না পেরে জাভেদ কাকার সামনে গিয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলতাম। কিন্তু আইসক্রিম খেতে না পেরে যতটা না অতৃপ্তিতে ছিলাম তার চেয়ে বেশি অশ্বস্তিতে ছিলাম জাভেদ কাকার ঋণ শোধ করতে না পেরে। এজন্য তার সামনেও যেতে লজ্জা পেতাম। অবশ্য বেশি দিন তার সামনে যেতে হয়নি। গ্রামের বদ ছেলের সঙ্গে মিশে উচ্ছন্নে যাওয়ার আশংকায় আমার সচেতন বাবা ও মা আমাকে শহরের একটা স্কুলে ভর্তি করে দিল। থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা হলো মেঝো খালার বাসায়।

সেই যে গ্রাম ছাড়লাম আর ফেরা হয়নি।
শহরের স্কুলে পড়তে গিয়ে শৈশবের প্রাইমারি স্কুলের পলেস্তরা খসেপড়া পুরনো দালানের কাঠের আধভাঙা বেঞ্চে বসে প্রথম পাঠ নেয়া আমার সহপাঠীদের কথা ভুলে গেলাম।

ভুলে গেলাম জালিবেত হাতে নামতা পড়ানো বাজখাঁই কণ্ঠস্বরের মোস্তফা স্যারের কথাও। শহুরে যান্ত্রিক যানের ভেঁপুতে ভুলে গেলাম ফসলের মাঠ থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক, অরণ্য আঁধারে জোনাকির সিম্ফনি।

ল্যাম্পপোস্টের মাথায় জ্বল্জ্বলে বৈদ্যুতিক আলোয় হারিয়ে ফেললাম নারিকেল গাছের চিরল চিরল পাতার ফাঁকে জেগে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের অবারিত আলোর উন্মাদনা। চেনা অচেনা মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেল কেরোসিন তেল ও লবণ নিয়ে প্রাক-সন্ধ্যায় হাট থেকে বাড়ি ফেরা গ্রামের সেই সব কিষাণ, যাদের নাকের ডগায় লেগে থাকত শীতকালে ঘাসের ওপরে জমে থাকা শিশিবিন্দুর মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। আধুনিক হেয়ার স্টাইলের ছিপছিপে তরুণীদের কাছে ম্লান হয়ে গেল রঙিন ফিতে দিয়ে মাথার চুল দুই ভাগ করে বেঁধে পাঠশালায় যাওয়া আমার বালিকা সহপাঠীরা। আসলে শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় গ্রামের কথা, গ্রামের মানুষের কথা একেবারে ভুলে গেলাম। কিন্তু জাভেদ কাকাকে ভুলিনি। মাঝেমধ্যে তার কথা মনে পড়ত। সবেচেয়ে বেশি মনে পড়ত দুধমালাই আইসক্রিম খেয়ে তাকে দশ টাকা দিতে না পারার কথা। কালেভদ্রে গ্রামে গেলে জাভেদ কাকার খোঁজ করতাম। কিন্তু কেউ তার খোঁজ দিতে পারত না।

নীল ব্লেজার পরা লোকটার অফিসের সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল বলে জাভেদ কাকা রেখে চলে গেল। আমি তাকে যেতে দিলাম। অফিস শেষে রাতে আরেকবার এখানে আসবে বলে লোকটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল। জাভেদ কাকার যাবতীয় ট্রিটমেন্ট শেষ করে বেডে পাঠিয়ে দিলাম। রোগির লম্বা লাইন সামলে ঘণ্টা চারেক পরে এসে জাভেদ কাকার পাশে বসলাম। নিচু গলায় ডাকলাম, ‘জাভেদ কাকা!’
জাভেদ কাকা কোনও কথা না বলে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’
‘না।’ জাভেদ কাকা মাথা নাড়ালেন।

আমার পরিচয় দিয়ে ছোটবেলায় আইসক্রিম খেয়ে তাকে দশ টাকা দিতে না পারার কথা মনে করিয়ে দিলাম। কিন্তু সে তা মনে করতে পারল না। বেশ খানিকটা সময় ব্যয় হওয়ার পর মনে করতে পারল। মনে করতে পেরে একটু হাসল। হেসে বলল, ‘অ। তুমি হেই পোলাডা? এহনও সেই কথাডা মনে রাইখেছ?’
‘হ, ঋণের কথা কি ভোলা যায় কাকা?’
‘এহন ঋণ শোধ করবা বুঝি?’
‘দুধমালাই আইসক্রিমের সেই দশ টাকা ঋণ শোধ করতে আপনাকে অনেক খুঁজেছি! কোথাও খুঁজে পাইনি। এখন যেহেতু খুঁজে পেয়েছি তো ঋণটা শোধ করতে চাই।’ বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে কথাটা বলে আমি পকেট থেকে একটা একহাজার টাকার নোট বের করে জাভেদ কাকার হাতে দিলাম। নোট হাতে না নিয়ে কাকা অবাক চোখে একবার টাকার দিকে আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এইডা তো এক হাজার টেহার নোট! আমাকে এত টেহা দেও ক্যান?’

‘কাকা এইটা আপনের জন্য। আপনি এইটা রাখেন।’
‘আমারে কি লোভী মানুষ মনে অয় তোমার? বাবা আমি যদি লোভ করতাম তাইলে আইসক্রিম বেইচ্যা জীবন চালাইতাম না। আইসক্রিম বেইচ্যা বেইচ্যা কষ্ট কইরা টেহা রোজগার কইরা আমি আমার দুই ছেলেকে লেহাপড়া করাইছি। এহন ওরা কলেজের মাস্টর। আল্লায় আমারে অনেক দিছে। তুমি তোমার টাকা রাইখে আমারে দশ টেহাই দাও।’

আমি লজ্জায় নুয়ে পড়লাম। চোখ দুটো নামিয়ে পকেট থেকে দশ টাকার একটি নোট বের করে জাভেদ কাকার হাতে দিলাম। জাভেদ কাকা হাসিমুখে টাকাটা হাতে নিল। পঁচিশ বছরের পুরনো ঋণ শোধ করতে পেরে আনন্দে আমার চোখের কোণে জমে ওঠা কয়েক ফোঁটা জল গালের দিকে নেমে পড়ল।

0 0 votes
Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments