দৈব
বিলকিস ঝর্ণা
ব্রীজের উপর কজন নীল পোষাকের পুলিশ।
পুলিশ দেখে আলতাব হোসেন মুখে মাস্ক পরে। হেঁটে হেঁটে ব্রিজ পার হয়ে আবার মাস্ক খুলে।
সে শ্বাস কষ্টের রোগী। মাস্ক পরলে দম বন্ধ হয়ে আসে।
ভোরের নিরবতার বাইরেও থমকে আছে পৃথিবী।শহরের গায়ে হেলান দিয়ে টিকে আছে শহরতলীর জীবন।নদীটা পার হলেই আলতাব হোসেনের কাঁচা ঘর।টিনের চালায় মাটির মেঝে। সে এখানে ভাড়াটে।
কোদাল আর বাঁশের ঝাঁপি সামনে নিয়ে বসে আলতাব হোসেন অপেক্ষা করছে। সাথে তারা মিয়া, আব্দুল হক সহ পরিচিত অপরিচিত আরও বিশ পঁচিশ জন।
পুলিশ দেখলে এদিক সেদিক পালায়।একে অপরের সাথে তিন হাত দূরত্ব বাড়িয়ে বসে।
মানুষের মাঝে চলছে চরম মানবিক সংকট।পৃথিবী হতে মানুষের অস্তিত্ব মুছে যায় কি না!
ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে ছয় কোটি বছর আগে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের প্রাগৈতিহাসিক অধিবাসী ডাইনোসরের অস্তিত্ব যেভাবে মুছে গেছে।
ডাইনোসরও ক্রমেই অতি হিংস্র হয়ে উঠেছিলো।
প্রকৃতি তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
প্রচন্ড গতিতে মহাকাশ থেকে ছুটে আসা গ্রহাণু পৃথিবীকে তীব্র আঘাত করে।জ্বলে উঠে নরকের ভয়াবহ দাবানল।কে জানে, হয়তো ডাইনোসরদের চরম বেয়ারাপনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেড়ে শিঙ্গায় ফুঁ দিয়েছিলো দায়িত্বরত ঈসরাফিল ।সম্ভবত তারই নির্দেশে নিক্ষেপিত হয়েছিল গ্রহাণু।
তারই ঘর্ষণে তরতর করে সে আগুন ছেয়ে যায় পৃথিবীর তলদেশের বনভূমি।
জুরাসিক যুগের বৃহদাকার সেই বিশেষভাবে অভিযোজিত স্থলচর সিলুরোসরিড থেরোপড ডাইনোসরই আজকের বিবর্তিত পাখি বিশেষ।
অথচ সেই ভয়াবহ দুর্যোগে ইঁদুর শ্রেণির স্তন্যপায়ীরা ঠিক বেঁচেছিলো।
পৃথিবীতে যে যত বড় তার বেঁচে থাকার আয়োজন টাও তত বড়।
আর তাইতো বিশ বছর জীবন পার করে প্রজননে সক্ষম হয় ডাইনোসর। আর ইঁদুর শ্রেণির মাত্র ২০ দিন।প্রয়োজনে সে গর্তে লুকিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
অস্তিত্ব রক্ষায় মানুষও নিম্নশ্রেণীর কীটে পরিণত হয়ে গেছে।
ধীরে হেঁটে বড় পাকা রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায় আলতাব হোসেন। চারিদিক খোলা আকাশের নিচে উঁচু জায়গায়। আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই,বড় গাছপালা নেই।ফসলহীন জঙ্গল আর জলা। কিছু কিছু বালি ফেলে ভরাটের কাজ থেমে গেছে। বাঁশে বড় সাইনবোর্ড লাগানো
–“এই জমির মালিক জাহাঙ্গীর আলম।”
কে এই জাহাঙ্গীর আলম।আজকাল এরকম জায়গার মালিকগণ বেশির ভাগই ভূমিদস্যু। এই মহামারীতে সেই ভূমিদস্যু জীবিত আছে কি না।
বাজারের ডিসপেনসারির কালাম ডাক্তার কদিন আগে আধপাগল হয়ে গেলো।কাশি, কফ আর গলা ব্যথা সঙ্গে জ্বর।বাড়ির সবাই তাকে বাইরের ঘরে রেখে দিলো।দূর থেকে তাকে খাবার ওষুধ পত্র দিলেও হাসপাতালের গাড়িতে তোলার লোক পাওয়া যাচ্ছিলো না।হাসপাতাল থেকে বেঁচে এলো ঠিক। কিন্তু তার মাথায় গন্ডগোল হয়ে গেলো।পরিবার ছেড়ে সে এখন একা বাজারের ডিসপেনসারিতে থাকে।
কখনও কখনও দু একটা গাড়ি ধুলো উড়িয়ে পাশ দিয়ে চলে যায়।
যাদের শ্রমিক দরকার তারা দামদস্তর করে পছন্দ মত নিয়ে নিচ্ছে।
আলতাব হোসেন রোজ বসে এই পথের ধারের শ্রমিকের হাটে।একদিনও তাকে কেও বাছাই করে না।সে বৃদ্ধ রোগা।শ্রমিক বিক্রয়ের পৃথিবীতে সে মূল্যহীন। আকাশের দিকে তাকায়। চোখ ঝাপসা লাগে।
ধীর গতিতে চলতে থাকে।
বাড়ি যেতে তার ইচ্ছে করে না।
প্রায় ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে মেসোপটেমিয়াতে প্রথম দাসপ্রথার খোঁজ পাওয়া যায়। সে এক অন্ধকার যুগ।দুনিয়া জয় করার নেশাগ্রস্ত বাইজেন্টাইন-উসমানিরাও পৃথিবীতে অনেক কৃতদাস তৈরি করে রেখেছিলো।
রূপ পাল্টে দাস বাণিজ্যের চাকা এখনও গতিশীল রয়ে গেছে সভ্যতার নাকের ডগায়।
বেছে বেছে দু এক জনকে কাজের জন্য নিয়ে যায় কেউ কেউ।
আলতাব হোসেনও বসে আছেন।
মুনসি বাড়ির ছোট ছেলে আলতাব হোসেন ঊনষাট বছর বয়সে শ্রমের বাজারে মানুষের দর কষাকষি শুনে।নিজেকে বিক্রির জন্য।
দুপুর গড়ায়। আলতাব হেসেনকে কেউ দরদাম করে না।
কোদাল ঝাঁপি হাতে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে।
সময় বড় নিরব
মানুষ নেই –চারিদিকে কেবল ঝাঁকে ঝাঁকে বন্য পাখি।অহেতুক উড়ে আর পাখা ঝাঁপটায়। একটা শিয়াল দৌড়ে সামনের জঙ্গলের ঝোপে ঢুকে।ঝোপের ভেতর থেকে মুখ বের করে আলতাব হোসেনের দিকে তাকিয়ে থাকে।শূন্য দুপুরে শিয়ালের চোখ দেখে তার ভয় লাগে।
ছোটবেলায় শিয়াল ডাকলে সে ভয় পেতো। বড় হতে হতে রাতের সেই শিয়ালের ডাক কান্নার মতো লাগে।
কেনো যে একদিন মেঝো খালা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো!
দের বছরের অবোঝ কন্যা শিশু মায়ের বুকের দুধ খেতে খুব কান্না করছিলো। সম্ভ্রান্ত মুসলিম নানা সকলকে অবাক করে আদেশ দেন–বাচ্চাকে মায়ের কাছে ছেড়ে দাও।
মৃত বাড়িতে এতো লোকের মাঝে বাচ্চাকে মায়ের কাছে নিয়ে বুকের কাপড় সরিয়ে দেয়। বানেছা তার মৃত মায়ের বুকে মুখ রাখে।একটু টান দেয়।
তারপর ফুপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে।
তসবি হাতে নানা তাঁর দের বছরের নাতনিকে কোলে তুলে নেয়।।বুকে তার সন্তান হারানোর আগুন।
সেই দিন সন্ধ্যার পর কবরের কাছে একসাথে কতগুলো শিয়াল ডেকে উঠে। সবাই লাঠিসোঁটা নিয়ে শিয়াল ধাওয়া করে। শিয়ালেরা খালার কবর অনেক খানি খুঁড়ে ফেলে। সবাই কদিন খালার কবর পাহারা দেয়।বার বার শিয়ালগুলো সুযোগ খুঁজছিলো।সে সময়ের কথা মনে করে আলতাব হোসেন শিউরে উঠে।তখন তার বয়স দশ-বারো।
নিঃশব্দে বারান্দায় মাটিতে বসে।
বানেছা একটা প্লেট রাখে সামনে।প্লেটে দুটো আলু – সিদ্ধ। আলতাব হোসেন ধীরে ধীরে আলু সিদ্ধ খায়।
অজু করে নামাজে দাঁড়ায় ।
নামাজরত আলতাব হোসেনের চোখে ভাসে দুটো সিদ্ধ আলু —
বানেছার না খাওয়া শুকনো মুখ–
কজন বসে থাকা বৃদ্ধ মজুর–
কোদাল ঝাঁপি —
নীল পোশাকের পুলিশ —
মাস্ক —
শিয়াল–
আলতাব হোসেন নামাজ না পরে উঠে দাঁড়ান।
তার হাঁপানির টান উঠে–
বানেছা বুকে পিঠে হাতিয়ে দেয়।একটু আরাম বোধ করে।
বলে–নামাজটাও পড়তে পারলা না!
আলতাব হোসেন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে
–বানেছা, তোমার মায়ের কথা মনে আছে?
সে অনবরত কাশতে বলতে থাকে —-অনেকগুলো শিয়াল তোমার মায়ের কবর খুঁড়ে লাশ তুলে ফেলছিলো প্রায়।সবাই কদিন লাগিয়ে কবর পাহারা দিয়েছিলো।তোমাকে বলেছে কেউ?
বানেছা তার দিকে তাকিয়ে থাকে।মাথা নাড়ে।বলে –না।
কত বছর আগের সে কথা তার মনে নেই।মা মারা যায় তার দের বছর বয়স তখন। মাকে ছাড়াই তার অভ্যাস হয়ে গেছে।মায়ের ভালোবাসা সে দেখে নাই।
বানেছার জ্বর জ্বর লাগছে।গলাও ব্যথা।ঘরে লেবু নাই,চা পাতাও নাই।প্রতিবেশীদের কেউ কারও ঘরে যায় না।
গতকাল পাশের একজন মারা গেছে। সাদা পোশাক পরা চারজন এসে লাশ নিয়ে গেছে।
রাত বাড়ছে বানেছার জ্বর বাড়ছে।শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।তার ভয় ভয় লাগছে।
সাদা পোশাকের চারজন স্বেচ্ছাসেবক এসে বানেছার লাশ নিতে নিতে বেলা গড়িয়ে যায়।
আলতাফ হোসেন সন্ধ্যায় গোরস্থানে কবরের পাশে দাঁড়ায়।
সারি সারি নতুন কবর।
দূরে কোথাও শিয়াল ডাকে।