একটি প্রদীপ জ্বালব বলে

By Published On: April 21, 2026Views: 0

একটি প্রদীপ জ্বালব বলে
ইসমত শিল্পী

কবিকন্যা শ্রাবন্তী ভৌমিক বাবা সম্পর্কে একজায়গায় উল্লেখ করেছেন, ‘শিক্ষক-অধ্যাপক হিসেবে বাবার যে মোহ আমাকে আশিষ্ট করে রেখেছে, তারই পাশ দিয়ে সমান্তরাল পথেই বয়ে চলেছে বাবার ছড়ার ছন্দের কারুকার্য। সেগুলিই আমার মনে আলোড়ন তোলে খুব। আমি আবাল্য জানি, বাবা ছন্দশিল্পী, ছন্দেই বাবার হাঁটাচলা, ছন্দেই ওঠা-বসা।’ একথা স্বীকার করতেই হবে যে, তিনি কবিতা রচনায় যেভাবে ছন্দ নিয়ে খেলেছেন, ছন্দেও উপর্যুপরি ব্যবহারেও অসংখ্য ছড়া সৃষ্টি করেছেন। যেন কথা বলার মতোই চলে এসেছে অজান্তে, স্বভাবে এবং বিভায় যা উজ্জ্বলতর ছড়াশিল্প এবং অতি আদুরে ঢঙের। আলাদা করে মুখস্থ করার চেষ্টা না করলেও মননে দাগ কাটে এবং মগজে চিন্তার খোরাকও আনে। কারণ, তাঁর ছড়ার প্রতিটি লাইনেই পাওয়া যায় চলমান ঘটনার চিত্র। বাস্তবতার রূপলাবণ্যে অতুলনীয় চেনা শব্দের মৌ মৌ গন্ধে ভরপুর সেসব ছড়ার শরীর। একটি ছড়া শেষ পর্যন্ত না পড়ে রেখে দেওয়া যায় না; ভিরমি খেতে খেতে চোখ রাঙাতে রাঙাতে শেষের লাইনে এসে স্তব্ধ হয়ে থামতে হয়। তাঁর ছড়া আর তখন শিশুপাঠ্য ছড়া থাকেনা, সমাজের অন্তর্দর্পণ হয়ে ওঠে। সমাজের যে তথাকথিত বখাটে ছেলেমেয়েরা আমাদের ভদ্রলোকের কাছে চোখের পীড়াস্বরূপ হয়ে ওঠে তাদের যন্ত্রণাটাকে তিনি বের করে নিয়ে আসেন। যখন পড়ি:

‘আস্তানা নেই রাস্তায় ঘুরি
তাই বলে বলো মাস্তান?
র্ভিমি খেয়েছ আমাদের দেখে?
উঠেছে কি কারো শ্বাসটান?
অল্পস্বল্প রুখে না দাঁড়ালে
ভাবো কি এখনো বাঁচতাম?
এমন-কী যদি চোখ না রাঙাই
স্টপে যে থামে না বাসট্রাম!’
‘মাস্তান’

এই লেখাটি পড়বার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে হয়, এরা তো আমাদের ঘরেরই সন্তান সন্ততী। আমরাই এদের সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা দিতে পারিনি। অথচ এদের সমাজে এদের বেঁচে থাকবার তীব্র ইচ্ছা। আর রসেই জন্যেই ভালোবাসার এই সমাজটাতে দাঁড়িয়ে থাকবার জন্যে এদের মস্তানের মুখোশ পরে নিতে হয়। ছড়াটা পড়তে পড়তে আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন জাগে আমরা যে ভদ্রলোকের মুখোশ পরে চলি, সইে মুখোশের ভয়্কংরতা তাদের থেকে একটুও কি কম?

প্রতিবাদ মানেই রুখে ওঠা না, উচ্চকণ্ঠ না। প্রতিবাদ যে কত শৈল্পিক হতে পারে তা বোঝা যায় এই ছড়ার ভাঁজে ভাঁজে। সুন্দরভাবে সঠিক বিষয়টি চিহ্নিত করা, বুঝিয়ে দিতে পারা এবং উপলব্ধি করার নিখুঁত ও আশ্চর্য সৃষ্টি এই ছড়া। ‘অল্পস্বল্প রুখে না দাঁড়ালে/ভাবো কি এখনো বাঁচতাম?’ এরকমভাবেই ক্ষমতার দিকে ভদ্রভাবে তীর ছুড়ে দিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ তাঁর ছড়ার ভেতর দিয়েই। শাসকদের প্রতিপক্ষে না দাঁড়িয়েও নিজের স্থানে সাবলীল থাকার অনড় ভঙ্গি লক্ষ করি এখানে। স্পষ্ট বুঝতে পারি, আমাদের ভণ্ডামির মুখোশ ক্ষমতার এবং অর্থনৈতিক দম্ভের। আর এদের মুখোশ শুধু অস্বিত্বরক্ষার জন্যে।

‘ছোটদের আবিষ্ট করা লেখা তিনি অনেক আগে থেকেই লিখেছেন। সেগুলো আনন্দমেলায় প্রকাশিত হতে থাকে ১৯৭২-৭৩ সাল থেকে তাঁর ছড়া। শুরু হয় বাংলা ছড়ায় অন্ত্যমিলের একটা নতুন খেলার ধারা। ‘জণ্ডিসে’ আর ‘বন্দী সে’– এই ভাঙা অন্ত্যমিলের খেলা তখন তাঁর রচনায় জমজমাট! তৈরি হচ্ছে : ‘গন্ধমাদন পর্বতে/ফলত নাকি বরবটি?’ কিংবা ‘লঙ্কাতে কি হিঞ্চে নেই?/ওসব ওজর শুনছি নে।’ একই সাথে মুক্তমিলের উদাহরণও পাই তখনকার ছড়াগুলোতে। ভাঙা অন্ত্যমিলের মধুর এক দ্যোতনা ছুটিয়ে নিয়ে যায় সাবলীলভাবে। যখন তিনি বলেন :

বলতে বলতে লঙ্কারাজ
দেখতে গেল কুচকাওয়াজ।

খেপলে কিন্তু সত্যি সে
মারবে ছুঁড়ে শক্তিশেল
—————-
সর্ষে হলে ধানগাছে
করবে না আর দাঙ্গা সে।

খান না চিনি গুড় সীতা
শাকের শোকে মূর্ছিতা।

এখানে লক্ষ করবার বিষয় যে, নিম্নরেখ শব্দগুলোর অন্তমিলে তিনি অদ্ভুত বিশেষত্ব রেখেছেন। ‘সত্যি সে’, তার সঙ্গে অন্তমিল দিয়েছেন ‘শক্তিশেল’। আমরা ইংবেজি ছড়ার অনুসরণে শেষ বা অন্তর্ধŸনিটি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যাতে ছন্দবৈচিত্রও এসেছে। আবার অন্তমিলেও বিশেষত্ব এসেছে। ‘সত্যি’ শব্দের পরে ‘সে’ তারপরে মিলিয়ে দিয়েছেন ‘শক্তিশেল’। ‘শক্তিশেল’ শব্দের ‘ল’ ধ্বনিটিকে পড়বার সময় প্রায় হালকা করে উড়িয়ে দিতে হয়। অথচ ‘শক্তিসেল’এর ‘সেল’ কখনো মুছে যায় না। আবার ‘ধান গাছে’ এবং ‘দাঙ্গা সে’- এর অন্তমিল আবার ভিন্নধরণের বৈচিত্রে উজ্জ্বল। ‘দাঙ্গ সে’ এই দুটো শব্দ যখন ধান গাছে’র অন্তমিল হিসেবে আসে তখন ধ্বনিবৈচিত্রকে ‘দাঙ্গা’র সঙ্গে মিলিয়ে ‘ধান গা’ এবং ‘সে’র সঙ্গে মিলিয়ে ‘ছে’ – এইভাবে পড়তে হয়। এই যে ধ্বনিবৈচিত্র এমন অন্তমিল সুক্ষ্ণ রুচিবোধ এবং শ্রবণক্ষমতা না থাকলে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। আরেক ধরণের অন্তমিলের পরীক্ষা হয়ে গেল ‘গুড় সীতা’ এবং ‘মূর্ছিতা’র সাথে। ‘গুড়’ এবং ‘সীতা’ এই দুটো শব্দের সাথে ছন্দের প্রয়োজনে ‘র্মূ ছিতা’ শব্দ এনে ছন্দ মাধুর্যের বৈচিত্র্য আনা হলো। এর আগে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এমন অন্তমিলের বিচিত্র ব্যবহার সচারচর অন্য কবিদের দেখা যায় নি। উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দু’টি পঙক্তি আনা যায় :

‘বান্ধবীকে গান শোনাতে ডাকতে হয় সতীশকে
মনটা আমার ঘুরে মরে গ্রামফোনের ডিস্কে।

এখানে অদ্ভুত মিল নিয়ে এসেছে ‘স তীশকে’, তার সঙ্গে মিলিয়েছেন ‘ডিস্কে’ আর ‘স’ কে একটা অতিরিক্ত মাত্রা হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন আগে। এমন বৈচিত্র্যেরই উত্তরাধিকার শঙ্খ ঘোষে।

মজা করতে করতে সিরিয়াস ভাবনা প্রকাশের যে চিত্র তা-ও আমরা দেখতে পাই শঙ্খ ঘোষের ছড়ায়। গুরুত্ব না দেওয়ার ভান করে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী বা গল্প তিনি বলে গেছেন অবলিলায়। উল্লেখ্য যে, গন্ধমাদন পর্বতে যা কিছু আছে সমস্ত কিছুই মানুষের জন্য ভীষণ উপকারী। সেই সাথে এই ছড়ার ধ্বনিগত মূল্যও অসাধারণ।

শঙ্খ ঘোষের ছড়া তাঁর কবিতা এবং গদ্যের মতোই স্বচ্ছল ও সাবলীল। তরতরিয়ে বয়ে চলা গঙ্গা কিংবা ভাগীরথী। পদ্মা যমুনা এক করে দেবার বাসনালব্ধ প্রতিক্রিয়া ফুটে ওঠে, স্পর্শ করে হৃদয়ের গভীরে। টানটান উত্তেজনা টের পাই সেই শব্দের জলকোলাহলে। তিরতির মায়াবী কম্পন কাপিয়ে দিয়ে যায় বুকের সবখানিকে। বেজে চলে শুধুই ঝংকারে নয়, বাঁশির ধ্বনিতে। অনুভূতির মায়াজাল ছড়িয়ে পড়ে। উষ্ণতার পারদ ঊর্ধ্বগতি হয় না বরং বলিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পাঠককে থামিয়ে রাখতে পারে চমৎকার মোহজালে বৈকালিক বাংলার আড্ডায়। খালের ধারে, লতাপাতার অন্ধকারে, বনবাদাড়ে। এখানে উল্লেখ করতে হয় ‘ঠাকুরদাদার মঠ’ ছড়াটির কথা :

খালের ধারে বনবাদাড়ে
লতার পাতার অন্ধকারে
দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুরদাদার মঠ
সেই মঠে তার শূন্য কোলে
একটি প্রদীপ জ্বালব বলে
খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছি না তার পথ।
কত গোপন দুঃখ রটায়
সুপুরিগাছ ঝুমকো লতায়
কত বছর, কত-না মাস, দিন
সেসব তুমি ভুলেই ছিলে
টের পাওনি এই নিখিলে
সময় কেমন হয়েছে উড্ডীন।
আজ কি তোমার পায়ের কাছে
অন্য সোনার মাটি আছে?
অন্য আলো আছে তোমার চোখে ?
আজ তোমাকে টান দিয়ে নেয়
এই শহরের ন্যায়-অন্যায়
ঘিরছে কেবল নতুন-নতুন লোকে।
এসব যদি জানোই মেকি
এসো আবার স্বপ্ন দেখি
উড়িয়ে দাও সমস্ত সংকট—
বাইরে যতই কুজ্ঝটিকা
দুই চোখে হোক দিব্য শিখা
বুকের মধ্যে ঠাকুরদাদার মঠ।
‘ঠাকুরদাদার মঠ’

এই ছড়ার পুরোটা জুড়ে আছে বাংলাদেশ। শঙ্খ ঘোষ জন্মসূত্রে পূর্ববাংলার মানুষ। যখনই বাংলাদেশে গেছেন তাঁর ফেলে আসা ভিটে দেখতে গেছেন। তখনই সেখানকার বারান্দা সেখানকার ছোট্টবেলায় লাগানো আমগাছ বা ছোটখাটো সমস্ত স্মৃতি জড়িয়ে নিয়েছেন বুকের মধ্যে। সারা শরীর এবং মন জুড়ে অনুভব করতে চেয়েছেন তাঁর ছোটবেলার খেলার জায়গাগুলো। একদিন যে বারান্দায় বসতেন সেই বারান্দায় বসে পা ঝুলিয়ে থাকলে মাটিতে তাঁর পা ছুঁতো না, যে গাছটাকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরতেন ছোটবেলায় এখন আর সেই গাছটাকে দ’ুহাতের মধ্যে ধরতে পারেন না। দিন পেরিয়ে এসেছে বহুদিন তাঁর পা দুটোও বড় হয়েছে, বারান্দায় বসে এখন তাঁর পা মাটি ছুঁয়ে যায়। গাছটা মোটা হয়েছে, শঙ্খ ঘোষের দুই বাহুর মধ্যে আর আটকে থাকে না। এইসমস্তকিছুই তিনি অনুভব করেন গভীর মমতায়। আপাতভাবে শিশুপাঠ্য হিসেবে লেখা যে তিনটি গদ্য আমরা পড়ি, সকাল বেলার আলো, সুপুরিবনের সারি, আর ইছামতির মশা। এই লেখাগুলোর মধ্যে রয়েছে তাঁর ঠাকুরদাদার মঠের বিবর্তনের স্মৃতি। কলকাতার শহুরে জীবনের মধ্যে এসেও তিনি বুকে ধারণ করে থাকেন ঠাকুরদাদার মঠ।

এতো ছোট লেখায় বাল্য থেকে কৈশর, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্বের বিবর্তনের স্মৃতিটি ছড়ার মধ্য দিয়ে ধরে রেখেছেন শঙ্খ ঘোষ। অসাধারণ কারুকাজ স্মৃতির কোঠরে। সেই সাথে শঙ্খ ঘোষের ছড়ার ক্ষেত্রে দেখি আরেক মেধাবি কলমের আঁচড়।

রবীন্দ্রনাথ এবং শঙ্খ ঘোষ যেন একই; কোথাও কোথাও মিলিয়ে ফেলি আমরা। দুজনকে আলাদা করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। শঙ্খ ঘোষের ছড়া উপনিষদে আকান্ত এবং আচ্ছন্ন। আমাদের চিন্তার খোরাক। আমাদের জীবন প্রবাহ যেন মিলেমিশে রয়েছে এই ছড়ায়। যার ফলে উত্তর প্রজন্ম প্রভাবিত হয়। এমনকি প্রবল তারুণ্য লক্ষ করি। ছড়া যে শুধু শিশুদের জন্যে, শঙ্খ ঘোষের ছড়ায় তা মোটেই মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথের মতোই হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে চলে যান কত গভীরে!

মাতৃভূমি, দেশ, মানুষ, মানুষের কথা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, রাজনীতি সমস্ত চিত্র ধরা দেয় তাঁর ছড়ায়। সবকিছু মিলেমিশে একাকার। গল্প বলতে গিয়েও দেশের জন্যে কেঁদে উঠেছে তাঁর প্রাণ। সকলখানে গানে তানে, দুঃখে সুখে লীন হয়েছেন দেশের অনুভূতিতে। কী স্বপ্নে, কী জাগরণে হারিয়ে যাওয়া দেশ তাঁকে আকড়ে ধরেছে। তার পরিষ্কার চিত্র পাই তাঁর ছড়ায়, যখন পড়ি ‘হারিয়ে-যাওয়া দেশ’:

‘বললে এটা ভুল হবে কি
যখন কোনো স্বপ্ন দেখি
তখন কেবল তোমার মুখই ভাসে
যখন থাকি আপনমনে
কিংবা আধো জাগরণে
তখনও তো আমায় ছাড়ে না সে।’
—————————
—————————
তুমি আমার চিরকালীন
একলা থাকার দুঃখতে লীন
তুমি আমার হারিয়ে-যাওয়া দেশ!
‘হারিয়ে-যাওয়া দেশ’

কিংবা

‘আমার আছে পদ্মানদী’ ‘আমার আছে গঙ্গা’
‘আমার আছে খুলনা-যশোর’ ‘আমার আছে বনগাঁ’
—————————
—————————
‘তর্কটা তাই এইখানে ভাই ক্ষান্ত করে দে–
কোন্টা যে ঠিক আমার আমি বল্ তো আমি কে?’
‘কোনটা আমি’

এখানেও দেখি, দুই বাংলাকে ছড়ায় ছড়ায় লেপ্টে থাকতে। একইসাথে বাংলাদেশের সাগরদাঁড়ি, কক্সবাজার পাড়ি দিয়েছেন। খেতখামার, খালবিল শিলাইদহ, যশোর সমস্ত গেঁথেছেন একই সুতোয়। সবকিছু সাঁতরে ছুটতে ছুটতে উঠে গেছেন দার্জিলিঙের চুড়োয়। পদ্মা, রূপনারায়ন, গঙ্গা, রূপসা ছঁয়ে দিচ্ছেন একইসাথে। স্মরণ করেছেন শান্তিনিকেতন, ভূবনডাঙার মাঠ সহ অনেককিছু। কিছুই ছাড়তে পারেননি তিনি। ছড়ায় ছড়ায় কীভাবে গড়িয়ে নিয়েছেন নিজেকে, এই ভেবে অবাক হতে হয়; রবীন্দ্রনাথ সহ পুরো বাংলাকে ছেয়ে রেখেছেন শব্দে শব্দে। আশ্চর্যভাবে আটকে রেখেছেন পাঠকচিত্তকে।

ছড়ার ছন্দের একটা নতুন স্রোত এল ১৯৮৯-এর পর। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় ‘আমন ধানের ছড়া’, ১৯৯৬ সালে ‘আমন যাবে লাট্টুপাহাড়’। ২০০৩-এ ‘ওরে ও বায়নাবতী’, ২০০৭-এ ‘আমায় তুমি লক্ষ্মী বলো’। শঙ্খ’র কলম তখন ছড়ায়-ছন্দে বিভোর। বেশ কয়েকটি ছড়া ছন্দমাধূর্য্য সমেত দাপিয়ে বেড়ায় আমাদের সামনে। পাঠকচিত্তে আসন গেড়ে বসে আছে চিরদিনের জন্যে। আমরা সবাই জানি, গতানুগতিক পাঠ্য ইতিহাস আমাদের ছাত্রছাত্রীদের আদৌ আকর্ষণ করেনা। এ বিষয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের বিতরাগ বিষয়ে বেশিরভাগ শিক্ষকই একেবারেই উদাসীন। অথচ কোনো এক অলৌকিক কারিগর যদি হিস্ট্রি’র ‘মিস্ট্রি’গুলো আবিষ্কার করার কোনো কৌশল বাতলে দিতেন তাহলে কতই না মজা হতো। যেখানে আমরা বড়রাও এই ছড়া পড়তে পড়তে মাথায় স্ক্রু বসানোর মিস্ত্রির সন্ধান করতে থাকি মনে মনে।

যেমন:
যখন নামে বৃষ্টি
পড়তে বসি হিস্ট্রি।
কিন্তু কেন
সব ভুলে যাই
সেটাই একটা মিষ্ট্রি।

ইলতুৎমিস মেগাস্থিনিস
কিসের জন্য এসব জিনিস
কেই-বা ছিল খসরু, কে বা
মৈনুদ্দিন চিস্তি–
থাকত মনে
মাথায় যদি
স্ক্রু বসাত মিস্ত্রি
নইলে দেখি ঘোর মুশকিল
করতে পারে হিস্ট্রি ।
‘হিস্ট্রি

আমাদের প্রত্যেকটি শিশুমনে কল্পনার একটা ফ্যান্টাসি-ল্যান্ড আছে। এই ফ্যান্টাসি ল্যান্ড এ অতিবড় গুরুগম্ভীর রাজা-রানী, বা সম্রাট সম্রাজ্ঞী অথবা কোনো বিপ্লবী পুরুষ তাঁদের নিজের বৈশিষ্ট্য ভুলে গিয়ে ইতিহাস থেকে নেমে আসতে পারেন একেবারে শিশুদের কল্পজগতে। এমনি একটা কল্পজগতের বাসিন্দাদের সঙ্গে খেলা করতে চলে এসেছেন টিপু সুলতান। এ যেনো শিশুদের খেলাঘরে নকল সাজপোশাক পরে যাত্রার মঞ্চে নেমে পড়া। গম্ভীর প্রতিবাদী এক টিপু সুলতান কী অক্লেশে হুকোয় টান দিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করছেন। আর অভিজ্ঞতা না থাকার ফলে কেশে মরছেন। তার মাঝেই একটা সঙ্গিতময়তার আবহ তুলে ধরেছেন শেষ দুটি পঙক্তিতে :

টুপি খুলছেন
টিপু সুলতান
কিছু ভাবছেন
কিছু বলছেন
আর কলকেয়
দিয়ে ভুল টান
কেশে মরছেন
টিপু সুলতান।

হুঁকো- বরদার
বলে ‘সর্দার
ওরা বজ্জাত
যত গর্জাক
নেই আপনার
কিছু ভাবনার
দেশ পালটান
দেশ উলটান-

শুনে হাসছেন
আর কাশছেন
দিয়ে ভুল টান
মহা সুলতান
নেই ঢাক-ঢাক
ক’রে হাঁক ডাক
দেশ পালটান
দেশ উলটান

আর মুলতান
গান সুলতান।
‘সুলতান’

ছড়া লিখতে লিখতেই ছড়ার মধ্য থেকেই আপাতমিথ্যের সূত্র ধরে কেমন করে সত্যের গভীরতায় চলে যাওয়া যায় তার একটুখানি উদাহরণ দিই :

‘লোকে আমায় ভালোই বলে, দিব্যি চলনসই –
দোষের মধ্যে, একটু না কি মিথ্যে কথা কই।’

‘বলি না তাই সেসব কথা, সামলে থাকি খুব,
কিন্তু সেদিন হয়েছে কী – এম্নি বেয়াকুব –
আকাশপারে আবারও চোখ গিয়েছে আট্কে
শরৎমেঘে দেখতে পেলাম রবীন্দ্রনাথকে!’
‘মিথ্যে কথা’

‘মিথ্যে কথা’র আঙ্গিকে একটা গল্পের ছাঁদ শরতের মেঘের মতো ছেয়ে থাকে পুরোটা। ছোটদের সাথে সাথে বড়দেরও আকৃষ্ট করে সমানভাবে। আর এইখানেই শঙ্খ ঘোষের ছড়া শুধু ছড়া হয়েই থাকে না। ছড়ার আঙ্গিকে দার্শনিক বোধে আক্রান্ত হয়ে ওঠে। আমাদের মনে হয়, বিন্দু থেকে কিভাবে সিন্ধুর সৃষ্টি হয় তার প্রমান শঙ্খ ঘোষের ছড়া। আমরা জানি, একজন মা তার শরীর মনের সমস্ত সত্তা দিয়ে গড়ে তোলেন তার সন্তানকে। তার সন্তান তাঁরই শরীর এবং মনের থেকে জাত একটি সত্তা। সেই সত্তার মধ্যে তাঁরই অংশ বর্তমান। অর্থাৎ একটি সন্তানের মধ্যে মায়ের পূর্ণ অংশের প্রতিফলনই থাকে। ফলে সন্তান মায়ের প্রবহমানতারই আরেক রূপ। চমৎকারভাবে এই সত্যটিকে ধরেছেন, মায়ের তাঁর বাচ্চাকে এক বাটি দুধ খাওয়ানোর অতি সাধারণ একটা ছবির মধ্যে দিয়ে :

তখন থেকে এক বাটি দুধ
খাওয়াচ্ছি আর কাকে—
এ যে পূর্ণ থেকে পূর্ণ নিলে
পূর্ণ বাকি থাকে !
তোমার মতো একজনও তো
দেখি না এক লাখে
আর-কোনোদিন আনছি না আর
তোমায় কোলেকাঁখে।
বডড তুমি দুষ্টু, তুমি
জ্বালিয়ে খেলে মাকে—
পূর্ণতে তাই পূর্ণ মিলে
পূর্ণ হয়ে থাকে!

সমস্ত মানুষকে এমন পূর্ণরূপে দেখার চোখ ই শঙ্খ ঘোষের কাঙ্খিত।

0 0 votes
Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments