মে দিবস আসে যায়
মুরাদ ক্লালভী
মহল্লার অলিতে-গলিতে পান সিগারেট বেচে বেড়ায় মধ্যবয়সি
যুবক।
পাড়ায়-পাড়ায় ”বাদাম,এই বাদাম..”হাঁকে একটি কিশোর।
আপা,ফুল লাগবে..? ফুল..? বলে বকুলের মালা হাতে তুলে দেয়
রমনা-টিএসসির এক কিশোরি। ক্যাপ আর টি-শার্টের পসরা
সাজিয়ে
চারুকলায় বসে থাকে বৃদ্ধ বাবা। বইপোকার খাদেম আলী, হারুনের
দোকানের সিঙ্গাড়া-সমুসার কারিগর, হাইকোর্টের সাহেবদের
সু-পলিশ
করা জাঁদরেল মুচি আলমগীর। ভিক্টর বাসের কন্ডাক্টর রহমত,
গলায় ডাক বিরামহিন যার, ”এই সিট খালি আগে, আব্দুল্লাপুর
আগে..”।
ডালায় সাজিয়ে এক হালি ইলিশ,শীতের রাতে কাঁপে,
শুকনো ছিপছিপে মাছের খুচরা ব্যাপারি।
মুয়াজ্জিনের আযানের আগেই যাত্রাবাড়ির মৎস ভান্ডারে
জমে ওঠে কোলাহল। দুর্বার খালাসি শ্রমিক
ভারি মোট বহন করে খালি করে ট্রাকের উদর।
খুক্ধসঢ়; খুক্ধসঢ়; কাশিতে হুক্কুর চাচা মেইলগেটের টঙ দোকানে,
ডিব্বা দুধের চায়ে চুমুক বসায় আর আঙ্গুলের চিপায়
ধরে সস্তা চুরুটে টান মারে ঘনঘন। কাকরাইল মোড় ছেড়ে
বটতলার ছায়ায় গা এলিয়ে দেয় রিক্সাওয়ালা।
চিতল পিঠা খায় আয়েশ করে চায়ে চুবিয়ে চুবিয়ে।
গেল জ্যৈষ্ঠে বউ গেছে তার ভেগে আপন ভাতিজার সাথে,
দুঃখের গল্প আঁটে বন্ধু আমড়াওয়ালার সাথে।
আসছে মাসে বছর হবে পূর্ণ তার।
গত বর্ষায় রাজশাহি ছেড়েছে কদম আলী,
”এহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে”-গল্প কয়
সাবিদার মায়ের লগে, পল্টনের চা-ওয়ালি।
বকেয়া টাকার জন্যে গলা ফাটায় পাশের বাড়ির
দারোয়ানের সাথে। দিন শেষে ফ্লাইওভারের পিলারের গোড়ায়
গা ঠেসে বসে টাকা গুনে হিসেব কষে উঠতি বয়সি এক
পকেটমার।
বেইলি রোডের মজু ফকির পাশেই অন্ধকারে বসে মোনাজাত ধরে।
কী যেন কয় বিড়-বিড় করে আল্লাহর কাছে।
ভাতওয়ালি সখিনা লাই ভরে টিফিন ক্যারিয়ারের বোঝা
বয়ে বেড়ায় অফিসে অফিসে।
সাহেবদের উদরপুর্তি করাতে হবে তাকেই।
হোটেলের রান্না ঘরে প্রচন্ড গরমে চুলার কোল
ঘেঁষে মসলা বাটে রহিমা। গত ফাগুনে সংসার গেছে
ভেঙ্গে অশান্তির আগুনে। অভিমানে যায়নি তাই আর বাড়ি।
বাংলা মটরে তপ্ত রাজপথে আগুন ঝরা রোদে হেঁটে।
ঠান্ডা পানির বোতল বেচে যে ছেলেটি,
এই ঈদেই বাসর হবে,যাবে সে বাড়ি।
এইসব নগর জীবন,সংগ্রামী মানুষের শ্বাস-প্রস্বাস।
আজ মাথায় লাল ফিতা বেঁধে মিছিলের শরীর রাঙায় তারা।
হাঁকে, ”দুনিয়ার মজদুর, এক হও।”
কেউ এসে হাতে গুঁজে দেয় দ’ুশো টাকা।
”মিয়া ভাই, খাওন দ্যাওনের কথা ছিল তো?”
”চুপ কর বেডি।” ধমকেই থমকে যায় মেহনতির চোখ।
বিড়বিড় করে দেয় অভিশাপ।
কয়, ”আমাগো মাথা বেইচ্যা খাবি তোরা খা।”
দিন শেষে সন্ধ্যা মাড়িয়ে রাতের আঁধারে ঝলসে ওঠে
পাঁচতারকা হোটেলের দেহ।
দিনের রোদে গলা ফাটানো তেজস্বী শ্রমিক নেতা,
শাইনিং গাড়ি হাঁকিয়ে ডিনার পার্টিতে ঢুকে পড়ে রাতে।
ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে মে দিবসের মিছিল ফেরা ক্ষুধার্ত
আমেনা।
মে দিবস আসে যায়।শিকাগো আসে, শিকাগো যায়।
স্লোগান থাকে একই।
মাথা বেচা দালালেরা রঙ বদলায়।
দুনিয়ার মজদুর দিশা হারায় ক্ষাুধায়-তৃষ্ণায়।