মে দিবস: পুঁজিবাদের যুগে শ্রমিক সংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক

By Published On: May 1, 2026Views: 4

মে দিবস: পুঁজিবাদের যুগে শ্রমিক সংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক
উৎপল সরকার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। ‘আরোগ্য’ কাব্যগ্রন্থের ‘ওরা কাজ করে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:

“ওরা কাজ করে
লৌহবাঁধা পথে অনলনিশ্বাসী রথে,
ধূলিধূসরিতধূমাবৃত
কলকারখানার চিমনিগুলি
ওদের কীর্ণ ধূলি।”

এই কবিতাটি কবিগুরুর শেষপর্যায়েরবাস্তবধর্মী রচনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারখানার ধোঁয়া-ধুলোয় কালো হয়ে যাওয়া শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমকে তিনি এখানে সম্মান জানিয়েছেন। শ্রমিকের ঘামে ভেজা হাত যে সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে — রবীন্দ্রনাথ সেই সত্যটিই তুলে ধরেছেন।
বিশ্বজুড়েপুঁজিবাদের প্রভাব যত বিস্তৃত হচ্ছে, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনও তত তীব্র হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে মে দিবস শুধু একটি স্মরণদিবস নয়, বরং সংগ্রাম, ঐক্য ও শোষণবিরোধীলড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। সহজ কথায়, মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় — শ্রমিক শ্রেণির অধিকার কখনো উপর থেকে দয়া করে দেওয়া হয়নি, তা আদায় করতে হয়েছে দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে।

মে দিবসের ইতিহাস শুরু হয় উনিশ শতকের শেষভাগে, শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। তখন পুঁজিপতিরা অধিক মুনাফার লোভে শ্রমিকদের দিয়ে দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করাতেন। কাজের পরিবেশ ছিল অস্বাস্থ্যকর, মজুরি ছিল নামমাত্র এবং শ্রমিকদের কোনো মৌলিক অধিকারই ছিল না। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে শুরু করেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল — “আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজের জন্য।”

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এই দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেন। কয়েকদিন পর হে-মার্কেট স্কোয়ারে সমাবেশে পুলিশের গুলি ও বিস্ফোরণে বহু শ্রমিক প্রাণ হারান। এই ঘটনা ‘হে-মার্কেট ট্র্যাজেডি’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এই আত্মত্যাগের স্মৃতিতেই পরবর্তীকালে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই ইতিহাস স্পষ্টভাবে শেখায় — শ্রমিকদের অধিকার কখনো সহজে পাওয়া যায়নি।

মার্ক্সবাদীদৃষ্টিভঙ্গিতে মে দিবসের গুরুত্ব আরও গভীর। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রিডরিখএঙ্গেলসদেখিয়েছিলেন যে, সমাজ মূলত শোষক ও শোষিত — এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপতিরাউৎপাদনের উপকরণের মালিক, আর শ্রমিকরা তাদের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। শ্রমিক যত বেশিউৎপাদন করে, তার প্রকৃত মূল্য সে পায় না; অতিরিক্ত মূল্য (সারপ্লাসভ্যালু) পুঁজিপতির পকেটে চলে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে মে দিবস শুধু স্মরণ নয়, বরং শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীক। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব সংগ্রামের মাধ্যমেই সম্ভব। মার্ক্সবাদের মূল বার্তা হলো — শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া শোষণমুক্ত সমাজ গড়া যায় না। তাই মে দিবসের সবচেয়ে বড় আহ্বান আন্তর্জাতিক সংহতি — বিশ্বের সকল শ্রমিক এক হও।
বর্তমানে পুঁজিবাদের রূপ অনেক বদলেছে, কিন্তু তার মূল চরিত্র প্রায় একই রয়ে গেছে। আগের কারখানা-কেন্দ্রিক শোষণের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট অফিস, আইটিসেক্টর, গিগইকোনমি ও অস্থায়ী চাকরির বাজার। বেশিরভাগ শ্রমিকের স্থায়ী চাকরি নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই, কাজের নিশ্চয়তাও নেই।

উদাহরণ হিসেবে শুধু অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি রাইডার নয়, পশ্চিমবঙ্গের চা বাগানের শ্রমিকরা দিনের পর দিন ২৫০-৩০০ টাকার মতো মজুরিতে কাজ করছেন। অনেক বাগানে মাসের পর মাস বকেয়া পড়ে থাকে, বাসস্থানের অবস্থা খারাপ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত। জুট মিলের শ্রমিকরা মিল বন্ধ ও কাঁচামালের সংকটে বারবার চাকরি হারাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালের নার্সরা দীর্ঘ শিফট ও কম বেতনে কাজ করেও স্থায়ীত্ব পান না। অস্থায়ী বা প্যারা শিক্ষকরা মাসে ৯,০০০-১৩,০০০ টাকায় স্কুল চালিয়ে যান, কিন্তু স্থায়ীকরণের দাবিতে বারবার আন্দোলন করতে হয়। এসব উদাহরণ স্পষ্ট করে দেয় — পুঁজিবাদ শোষণের পদ্ধতি বদলালেও, মূল লক্ষ্য একই: কম খরচে বেশি মুনাফা।
আজকের শ্রমিক শ্রেণি আর শুধু কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চা বাগানের শ্রমিক, জুট মিলের কর্মী, বেসরকারি নার্স, অস্থায়ী শিক্ষক, ডেলিভারি রাইডার, কৃষক, গৃহশ্রমিক ও শিক্ষিত বেকার যুবক — সবাই একই ব্যবস্থার চাপে পড়ছেন।

মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণ অনুসারে, এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও বটে। রাষ্ট্র প্রায়ই পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে, শ্রমিকদের দাবিকে উপেক্ষা করে। শ্রম আইন শিথিল করা, সংগঠন ভাঙার চেষ্টা ও বেসরকারিকরণ — এসব পুঁজিবাদী নীতির অংশ। ফলে শ্রমিকদের লড়াই মজুরি ও কাজের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেয়।

মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় — সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। বরং নতুন নতুন রূপে তা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা, সচেতনতা বাড়ানো এবং সংগঠিত করা — এই কাজগুলো আজও অত্যন্ত জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, মে দিবস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংগ্রামের পথপ্রদর্শক। পুঁজিবাদ যত শক্তিশালী হবে, মে দিবসের তাৎপর্য ততই বাড়বে। এটি আমাদের শেখায় — শ্রমিক শ্রেণির আসল শক্তি তাদের ঐক্যে, সচেতনতায় এবং অবিরাম সংগ্রামে।

সহজ ভাষায়, মে দিবস মানে অন্যায় মেনে না নেওয়ার দিন, নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার দিন এবং একসাথে লড়াই করার প্রতিজ্ঞা নেওয়ার দিন। এই প্রতিজ্ঞাই একদিন গড়ে তুলতে পারে একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ — যেখানে শ্রমের মর্যাদা থাকবে এবং কেউ কাউকে শোষণ করবে না।

লেখায় : উৎপল সরকার
নিউ টাউন আলিপুরদুয়ার, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
0 0 votes
Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments