মে দিবসের কবিতা

By Published On: May 2, 2026Views: 5

মে দিবসের কবিতা
শাহ্ কামাল

পুষ্পকানন

আমি বলে দিবো—
কোথায় দেখেছি প্রথম কদমফুল
কিংবা শিমুলফুল।
আমি নিশ্চয়ই বলে দিবো—
ভাঁটফুলের গন্ধ অথবা ঢোলকলমির ভালোবাসা।
আমি অবশ্যই বলে দিবো—
কস্তুরিফুলের কাব্যকথা।

জারুলকে চিনবার আগে অবশ্যই আমি সোনালু চিনেছি;
বাগানবিলাসীকে চিনবার আগে কৃষ্ণচূড়া।

অথচ আমার চোখ নিবদ্ধ
ঘাসফুলে;
মন নিবদ্ধ নীল অপরাজিতায়;
আমি হেসে উঠেছি শাদা শাপলার মালায়;
হাতিশুঁড়ফুলের কাছেই পেয়েছি আমার জমানো সকল আয়োজন।

আমি বলে দিবো—
কোথায় দেখেছি প্রথম সর্ষেফুল
কিংবা লাউ-শিম-কুমড়োফুল।
আমি নিশ্চয়ই বলে দিবো—
ঢেড়সফুলের গন্ধ অথবা চালতাফুলের ভালোবাসা।
আমি অবশ্যই বলে দিবো—
কামরাঙাফুলের উপকথা।

শিরিষকে চিনবার আগে অবশ্যই আমি মান্দার চিনেছি;
কাঠগোলাপকে চিনবার আগে রক্তজবা।

অথচ আমার চোখ আবদ্ধ
বুনোফুলে;
মন আবদ্ধ নীলপদ্মে;
আমি হেসে উঠেছি শালুক ফুলের মালায়;
বিষকাটালির কাছেই পেয়েছি আমার হারানো সকল আয়োজন।

২৮ এপ্রিল ২০২৬


কেউ না জানুক আমি জানি

আজ অনেকদিন হয়ে এলো, জানতে ইচ্ছে করে—
সেই রোদ খা খা করে রোদ্দুরে সে সাঁওতাল মেয়েটি কেমন আছে?

কত বড় হলো?
এখনো কি সে মেইল গেইটের ধারে কলসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে?
ভাঙ্গা মাটির দেওয়ালে পড়ে থাকা একগোছা শিমুলফুল দিয়ে বলেছিল,
বাবু— আবার আসবেন।

আজ অনেকদিন হয়ে এলো, জানতে ইচ্ছে করে—
সেই জোনাকবিহীন অন্ধকার রাতে যাত্রীছাউনির নিচে
শেষ রাতের ট্রেনের অপেক্ষায়—
একা বসে বসে থাকা প্রহর গোনা সে বাবা-হারা ফুলকুড়ানো মেয়েটি কেমন আছে?
কত বড় হলো?
এখনো কি সে তার আদরের ছোট ভাইয়ের খোঁজে দাঁড়িয়ে থাকে ইস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে?
একটা সাদাকালো ফটো দেখিয়ে বলেছিল,
মিয়া ভাই— কোথাও দেখতে পেলে জানাবেন।

আজ অনেকদিন হয়ে এলো, জানতে ইচ্ছে করে—
কফিন ফ্যাক্টরীর সে মেয়েটি কেমন আছে?
কত বড় হলো?
এখনো কি স্বপ্ন দেখে—
একদিন এক রাজপুত্র টগবগ ঘোড়া ধাবিয়ে আসবে নিয়ে যেতে তাকে?
দূর থেকে একটা বাঁশির শব্দ দেখিয়ে বলেছিল,
স্যার— আপনি বাঁশি বাজাতে পারেন?

ইচ্ছে করে—
ভীষণ ইচ্ছে করে
এই শহরের বড় বড় অট্টালিকার দিকে তাকিয়ে জানতে,
কেমন আছে রাতগুলো?
কেউ না জানুক আমি জানি—
ভোর আসবেই, আসবে।

পৃথিবী তার সব পাওনা ফিরেয়ে দেবে শ্রমিকের কাছে …

২১ এপ্রিল ২০২৬



ভেঙে যাক মিথ্যে সব শ্বেতপাথর

তাজমহলের দিকে তাকাতেই
তোমার কী মনে হয়?
কী অপূর্ব! কী সুন্দর! কী মনোমুগ্ধকর!

শ্বেতপাথর! অমর অজর প্রেম!
তাই তো?
আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমার মনে হয়—
শত শত মানুষের মুখ! তাদের হাত! তাদের হাতের আঙুল!
কী অপরাধ ছিল তাদের?
তারা কি ফাঁকি দিয়েছে কাজ?
চুরি করেছে কোনো রত্ন?
রাজপ্রাসাদের কোনো কুমারীর দিকে তাকিয়ে ছিল কি তাদের চোখ?

হে মার্কেটে সেদিন কী হয়েছিল?
কেন এত রক্তজবা সেদিন ফুটেছিল রাজপথে?
ওরা কী চেয়েছিল?
রাজার সিংহাসন! রাজার মুকুট! রাজার উত্তরাধিকার!

এই শহরে এত চাকা! এত কলকারখানা! এত এত অফিস-আদালত!
এই ফসলের মাঠ, এই কলের জাহাজ, এই বড় বড় অট্টালিকা!
কার কথা মনে পড়ে তোমার?
বিশ্ব ব্রহ্মার! বিশ্বকর্মার! বিশ্বমুনির!
চা বাগানের দিকে চেয়ে দেখো! কী দেখতে পাও?
গার্মেন্টস, চালকল, তেলকল, সিমেন্ট, রডকলের দিকে চেয়ে দেখো! কী দেখতে পাও?
কয়লাখনি, গ্যাসখনি, তেলখনির দিকে চেয়ে দেখো! কী দেখতে পাও?
হাটে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে চেয়ে দেখো! কী দেখতে পাও?
কে নিয়ে যায় বিদ্যুতের লাইন, গ্যাসলাইন, ওয়াসার লাইন?
ওরা কারা যাদেরকে ডোম বলো! মেথর বলো! দলিত বলো! অবাঞ্চিত বলো!

বলো! আমাকে বলো! ভাই তবে কে?
রক্তের সহোদর!
আমি তো জেনেছি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে কাজ করে;
আমি তো জেনেছি পায়ে পা মিলিয়ে যে কুচকাওয়াজ করে; যুদ্ধ করে;
সে-ই ভাই! সে-ই ভ্রাতা! তারে-ই সহোদর বলো!

কে দেয় তবে তারে গালি! কে দেয় তবে তারে লাথি!
কে বা-ই তারে দেয় গলাধাক্কা!
সে মানুষ! সে কি হতে পারে আমার ভাই! সে কি আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন!
কে তবে জোঁক! কে তবে হিংস্র বন্য শ্বাপদ! কে বা-ই তবে হন্তারক!
কার হাত-ই তবে সভ্যতার খুনে রাঙা মেহেদি হাত!

ফিরিয়ে দাও! ফিরিয়ে দাও! ফিরিয়ে দাও—
আমার সকল অধিকার:
আমার শ্রমের মূল্য, আমার ঘামের মূল্য, আমার রথের মূল্য!
আমার কর্ষিত ভূমির ন্যায্য ঘাম! আমার ব্যয়িত শ্রমের ন্যায্য দাম!

ভেঙে ফেল এই শৃঙ্খল
ভেঙে ফেল এই শৃঙ্খলবদ্ধ কারাগার
ভেঙে ফেল এই মিথ্যা প্রেমের স্মৃতিসৌধ, ভেঙে যাক মিথ্যে সব শ্বেতপাথর!

১৮ই এপ্রিল ২০২৬

0 0 votes
Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments